স্বীকৃতির অপেক্ষায় সোমালিল্যান্ড: তিন দশকের অমীমাংসিত লড়াই

লেখালোক নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক বিষয়
স্বীকৃতির অপেক্ষায় সোমালিল্যান্ড: তিন দশকের অমীমাংসিত লড়াই

আফ্রিকার মানচিত্রের দিকে তাকালে সোমালিয়ার উত্তর-পশ্চিমে এবং লোহিত সাগরের কৌশলগত উপকূলে গড়ে ওঠা একটি অঞ্চল দেখতে পাওয়া যায়, যা গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নেয়া এই ভূখণ্ডটির নাম সোমালিল্যান্ড। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের যা যা প্রয়োজন, যেমন- নিজস্ব মুদ্রা (সোমালিল্যান্ড শিলিং), স্বতন্ত্র পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং নিয়মিত বিরতিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার, তার সবই এখানে বিদ্যমান। অথচ আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির মারপ্যাঁচে বিশ্ব মানচিত্রে আজ অবধি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি। এটি পৃথিবীর এমন এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে রাষ্ট্রহীনতার বিশৃঙ্খলার বদলে গড়ে উঠেছে স্থিতিশীল এক আইনি কাঠামো। তবে সোমালিল্যান্ডের এই অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতা তাদের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়নি, বরং আত্মমর্যাদার এক নতুন লড়াইয়ের জন্ম দিয়েছে। এই লড়াই কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানার নয়, বরং একুশ শতকের বিশ্বে একটি জাতির আত্মপরিচয় ও বৈধতা আদায়ের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি।


প্রেক্ষাপট: একটি রাষ্ট্রের জন্ম ও বিলুপ্তি।


সোমালিল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাস অন্যান্য আফ্রিকান রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যার মূল প্রোথিত রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বৈত ধারায়। ১৮৮৪ সাল থেকে এই অঞ্চলটি ‘ব্রিটিশ সোমালিল্যান্ড’ হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখানে দক্ষিণ অংশটি ছিল ইতালির শাসনাধীন। ১৯৬০ সালের ২৬ জুন সোমালিল্যান্ড ব্রিটিশ শাসন থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কয়েক দিনের জন্য বিশ্ব দরবারে আবির্ভূত হয়। তবে বৃহত্তর সোমালি ঐক্যের আবেগে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা মাত্র পাঁচ দিন পর, ১ জুলাই তারিখে দক্ষিণ অংশের সাথে একীভূত হয়ে ‘সোমালিয়া রিপাবলিক’ গঠন করে। কিন্তু এই ভ্রাতৃত্বের মিলন দ্রুতই তিক্ততায় রূপ নেয় যখন তৎকালীন স্বৈরশাসক সিয়াদ বাররের সরকার উত্তরের জনগণের ওপর চরম বৈষম্য ও দমন-পীড়ন শুরু করে। আশির দশকে এই নির্যাতন চরমে পৌঁছায় এবং 'ইসাক গণহত্যা'র মাধ্যমে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়, যা একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। অবশেষে ১৯৯১ সালে সিয়াদ বাররে সরকারের পতনের পর, উত্তরের নেতৃবৃন্দ নিজেদের পুরোনো স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেন এবং একতরফাভাবে সোমালিল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তারা একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে টিকে থাকলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাদের কাছে আজও এক অধরা স্বপ্ন।


নিজস্ব শাসনব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতা।


সোমালিয়া যখন গত তিন দশক ধরে গৃহযুদ্ধ, সামুদ্রিক জলদস্যুতা এবং আল-শাবাবের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তান্ডবে বিপর্যস্ত ও একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে পরিচিত, সোমালিল্যান্ড তখন নিজেকে হর্ন অফ আফ্রিকার শান্তির দ্বীপে পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছাড়াই গত ৩৩ বছরে তারা একাধিকবার শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় নির্বাচন সম্পন্ন করেছে, যা এই অঞ্চলে বিরল। তাদের এই অনন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি হলো আধুনিক পশ্চিমা গণতন্ত্র এবং ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী সংস্কৃতির এক অসাধারণ মিশেল। এখানে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ হিসেবে কাজ করে ‘গুর্টি’ (Guurti) বা প্রবীণদের কাউন্সিল, যা গোত্রীয় দ্বন্দ্ব নিরসন এবং জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই হাইব্রিড মডেলটিই সোমালিল্যান্ডকে আফ্রিকার অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ দেশ থেকে আলাদা করেছে এবং সেখানে একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। কোনো বৈদেশিক সামরিক সহায়তা ছাড়াই তারা নিজেদের সীমান্ত রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, নিজস্ব রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে প্রতিকূল পরিবেশেও শান্তি বজায় রাখা সম্ভব। এই স্থিতিশীলতাই আজ সোমালিল্যান্ডকে একটি আদর্শ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির দাবিদার করে তুলেছে।


আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে অন্তরায়।


সোমালিল্যান্ডের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা থাকা সত্ত্বেও কেন তারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বৈধতা পাচ্ছে না? এর পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার এক জটিল মারপ্যাঁচ। মূলত নিচের তিনটি প্রধান কারণে তাদের স্বীকৃতি আজ অবধি অমীমাংসিত রয়ে গেছে:


ক। আফ্রিকান ইউনিয়নের রক্ষণশীল নীতি ও সার্বভৌমত্বের ভীতি। 

আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রধান নীতি হলো ১৯৬৩ সালের সেই সনদ, যেখানে বলা হয়েছে—আফ্রিকার দেশগুলোর ঔপনিবেশিক সীমানা কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না। তাদের ভয় সোমালিল্যান্ডকে যদি একবার স্বীকৃতি দেয়া হয়, তবে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে থাকা শত শত জাতিগোষ্ঠী নিজেদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের দাবি তুলবে। নাইজেরিয়ার বিয়াফ্রা থেকে শুরু করে কঙ্গো বা ক্যামেরুনের বিভিন্ন অঞ্চল একইভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করতে পারে, যা পুরো মহাদেশকে এক চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে। আফ্রিকান ইউনিয়ন মনে করে, সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতি হবে একটি ‘প্যান্ডোরার বক্স’ খোলার মতো, যা পুরো মহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রকে তছনছ করে দিতে পারে। সোমালিল্যান্ডের সকল গণতান্ত্রিক সাফল্যকে স্বীকৃতি দেয়ার চেয়ে তারা মহাদেশীয় অখণ্ডতা রক্ষাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।


খ। মোগাদিশুর দাবি ও ‘এক সোমালিয়া’ নীতির প্রভাব। 

সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতার পথে সবচেয়ে বড় আইনি ও রাজনৈতিক বাধা হলো সোমালিয়া সরকার। মোগাদিশু ভিত্তিক ফেডারেল সরকার সোমালিল্যান্ডকে তাদের একটি বিদ্রোহী প্রদেশ বা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে। তারা মনেকরে সোমালিল্যান্ডকে আলাদা দেশ হিসেবে মেনে নেয়া মানে সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বকে খণ্ডিত করা এবং ১৯০৬ সালের ব্রিটিশ-ইতালীয় একীভূত হওয়ার যে আবেগ ছিল তাকে পদদলিত করা। সোমালিয়া সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জোরালো লবিং চালিয়ে আসছে যাতে কোনো দেশ সোমালিল্যান্ডের সাথে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন না করে। এমনকি তুরস্ক বা কাতারের মতো দেশগুলো যখন মধ্যস্থতা করতে চেয়েছে, তখনও মোগাদিশু তাদের “এক সোমালিয়া” নীতির ওপর অটল থেকেছে। তাদের ভয় উত্তর অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে দক্ষিণ সোমালিয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যে লড়াই চলছে তা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।


গ। বৈশ্বিক পরাশক্তির সতর্কতা ও কূটনৈতিক জড়তা। 

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো সোমালিল্যান্ডের সাফল্যকে স্বীকার করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। এর মূল কারণ তারা এই অঞ্চলে নতুন কোনো সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে চায় না। পশ্চিমা দেশগুলো ‘আফ্রিকান সমাধানের জন্য আফ্রিকান নেতৃত্ব’ নীতি অনুসরণ করে। অর্থাৎ যতক্ষণ না আফ্রিকান ইউনিয়ন সবুজ সংকেত দিচ্ছে, ততক্ষণ বড় কোনো পরাশক্তি এককভাবে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয়ার ঝুঁকি নিতে চায় না। এছাড়া লোহিত সাগরের কৌশলগত অবস্থানে অবস্থিত হওয়ার কারণে অনেক দেশ মনেকরে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিলে ওই অঞ্চলের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো এই অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিতে পারে। তাই নৈতিকভাবে সোমালিল্যান্ডের দাবি শক্তিশালী হলেও বৈশ্বিক স্বার্থ ও ভূ-রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে তাদের স্বীকৃতি আজও ঝুলে আছে।


ভূ-রাজনীতি ও বারবেরা বন্দরের গুরুত্ব।


সোমালিল্যান্ডের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘বাব-এল-মান্দেব’ প্রণালীর ঠিক পাশেই। এই কৌশলগত অবস্থানই দেশটিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার চালে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটিতে পরিণত করেছে।


ক। লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার: বারবেরা বন্দরের কৌশলগত প্রভাব। 

লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত বারবেরা বন্দরটি কেবল সোমালিল্যান্ডের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র নয়, বরং এটি সমগ্র হর্ন অফ আফ্রিকার বাণিজ্যিক গেটওয়ে হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ এই জলপথ দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা এই বন্দরটিকে দুবাই পোর্ট ওয়ার্ল্ড (DP World) এরমতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত করেছে। বর্তমানে এই বন্দরকে কেন্দ্র করে আধুনিক অবকাঠামো এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে, যা সোমালিল্যান্ডকে কেবল সোমালিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি দেয়নি, বরং একে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরাশক্তি দেশগুলো যখন সুয়েজ খাল অভিমুখে তাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, তখন বারবেরা বন্দরের স্থিতিশীলতা তাদের কাছে সোমালিল্যান্ডের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই অর্থনৈতিক গুরুত্বই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্বীকৃতির পথ প্রশস্ত করতে পারে বলে অনেকে মনেকরেন।


খ। ইথিওপিয়ার সাথে সমঝোতা: স্বীকৃতির নতুন সমীকরণ। 

২০২৪ সালের শুরুতে ইথিওপিয়ার সাথে সোমালিল্যান্ডের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক এই অঞ্চলের রাজনীতিতে এক ভূ-কম্পন সৃষ্টি করেছে। ১২ কোটির বেশি জনসংখ্যার স্থলবেষ্টিত দেশ ইথিওপিয়া তাদের বাণিজ্যের জন্য মরিয়া হয়ে একটি সমুদ্রবন্দরের খোঁজ করছিল, আর সোমালিল্যান্ডের প্রয়োজন ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এই চুক্তির আওতায় ইথিওপিয়াকে ২০ কিলোমিটার সমুদ্র উপকূল লিজ দেয়ার বিনিময়ে তারা সোমালিল্যান্ডকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি সোমালিল্যান্ডের জন্য গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিজয়, কারণ ইথিওপিয়ার মতো একটি আঞ্চলিক শক্তি স্বীকৃতি দিলে অন্যান্য আফ্রিকান ও ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য সেই পথ অনুসরণ করা সহজ হবে। যদিও এই চুক্তি সোমালিয়া সরকারকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করেছে এবং তারা একে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে, তবুও সোমালিল্যান্ডের জন্য এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এক সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।


অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও জীবনযাত্রা।


আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকা সোমালিল্যান্ডের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা; কারণ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত না হওয়ায় তারা বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর মতো বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কোনো ঋণ, অনুদান বা সরাসরি বিনিয়োগ পায় না। ফলে দেশটির অর্থনীতিকে মূলত টিকে থাকতে হয় প্রবাসী সোমালিল্যান্ডারদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গবাদি পশু রপ্তানির ওপর নির্ভর করে। তবে এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্নতা তাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার উদ্যমকে দমাতে পারেনি। বরং স্বীকৃতির অভাবকে শক্তিতে রূপান্তর করে তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব রাজস্ব এবং ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মাণ করেছে দীর্ঘ রাস্তাঘাট, আধুনিক হাসপাতাল ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এমনকি আফ্রিকার অনেক স্বীকৃত দেশের চেয়েও তাদের শাসনব্যবস্থা ও জনসেবা অনেক বেশি গোছানো এবং স্বচ্ছ। বিদেশের কোনো সাহায্য ছাড়াই তারা যেভাবে নিজেদের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো এবং শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করছে, তা এক বিস্ময়কর মানবিক প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ। এই সীমিত সম্পদের মধ্যেও তাদের সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রা প্রমাণ করে যে, কেবল স্বীকৃতির অভাবে একটি জাতির এগিয়ে চলা থমকে থাকতে পারে না।


সোমালিল্যান্ডের তিন দশকের এই দীর্ঘ সফর প্রমাণ করে একটি রাষ্ট্রের বৈধতা কেবল কাগজের দলিলে নয়, বরং তার জনগণের সদিচ্ছা এবং সুশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থার মধ্যে নিহিত থাকে। যে অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা আর সংঘাত নিত্যদিনের সঙ্গী, সেখানে সোমালিল্যান্ড শান্তি ও গণতন্ত্রের এক ব্যতিক্রমী মিনার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি না মেলায় দেশটি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, যা আধুনিক বিশ্বের মানবাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ইথিওপিয়ার সাথে সাম্প্রতিক চুক্তি কিংবা বারবেরা বন্দরের অর্থনৈতিক উত্থান হয়তো দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থা ভাঙার প্রথম ধাপ হতে পারে। তবে সোমালিল্যান্ডের মানুষেরা ধ্বংসস্তূপ থেকে নিজেদেরকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে গড়ে তুলে বিশ্বকে এক নীরব বার্তা দিয়েছে, স্বীকৃতি কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আজ হোক বা কাল, আন্তর্জাতিক মহলের উপেক্ষা ভেঙে এই অমীমাংসিত লড়াইয়ের এক সম্মানজনক পরিণতি ঘটা এখন কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং এটি একটি জাতির টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতি ন্যায়বিচারও বটে।



পোস্ট ভিউঃ 14

আপনার মন্তব্য লিখুন