ভবিষ্যৎ সরকার কাঠামো কীরকম দেখতে চাই

লেখালোক সমসাময়িক বিষয়
ভবিষ্যৎ সরকার কাঠামো কীরকম দেখতে চাই

১  

৩৬ জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সীমাহীন সাহস আর আত্মত্যাগকে ভাষা দিয়েছিল দেয়ালে দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি ও কার্টুন। ছাত্র–জনতার আন্দোলন জোরালো করতে কার্টুন যে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা বোঝা যায় সেসময়ে আঁকা কার্টুনের সংখ্যা দেখে। সিনিয়র-জুনিয়র মিলে কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব, আহমেদ কবির কিশোর, মেহেদী হক এবং তার স্ত্রী মিতু, মাহাতাব রশিদ, নাজমুস সাদাত, আসিফ মাহবুব, রিশাম শাহাব তীর্থ, মানিক রতন, আরাফাত করিম, রায়িদ হোসেন, রাকিব, শাদাত মাহবুব, নাতাশা জাহান প্রমুখদের আঁকা কার্টুন সবার নজর কেড়েছে। তবে ৭ আগস্ট ২০২৪ তারিখে আঁকা একটা কার্টুন আলাদাভাবে বেশ আলোচিত হয়েছে।


কার্টুনিস্ট মিতু’র আঁকা কার্টুনটিকে নিয়ে আলাদা করে বলতে চাই। জাপানিজ হরর মুভি ‘দ্য রিং’-এ একটা প্রেতাত্মা টেলিভিশনের পর্দা থেকে বের হয়ে পৃথিবীতে এসে মানুষকে ভয় দেখায়। কার্টুনিস্ট মিতু সেই প্রেতাত্মার জায়গায় বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের কার্টুন এঁকে ফেসবুকে পোস্ট করেন। তার হয়তো ধারণা, অনেক বছর ধরে লন্ডনে থাকা তারেক রহমান এবার রাজনীতির ফাঁকা মাঠ পেয়ে দেশে ফিরবেন এবং অনেকের ওপর প্রতিশোধ নিবেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো জনাব তারেক রহমান কার্টুনটা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ না করে তিনি বরং তার ফেসবুকে সেটা শেয়ার করেন। তিনি পোস্টের ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘আমি কার্টুনিস্ট মেহেদীর ভক্ত, শিশির ভট্টাচার্যের কাজও উপভোগ করতাম। আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, তিনি শিগগিরই আবার নিয়মিত রাজনৈতিক কার্টুন তৈরি শুরু করবেন।’ তিনি ক্যাপশনে এও লিখেছেন, ‘আমি গভীরভাবে আনন্দিত যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। ২০০৬ সালের আগে বাংলাদেশি কার্টুনিস্ট, বিশেষ করে শিশির ভট্টাচার্য প্রায়ই আমার মা এবং আমাকে নিয়ে কার্টুন তৈরি করতেন।


আমি ৩৬ জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে এরকম একজন উদার এবং সহনশীল মনোভাবের রাজনৈতিক নেতাকে দেশের কর্ণধার হিসেবে দেখতে চাই। যেখানে সামান্য একটা কার্টুনের জন্য কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে জোরপূর্বক গুমের শিকার হতে হয়না। নিপীড়নের মুখোমুখি হয়ে শিশির ভট্টাচার্যকে রাজনৈতিক কার্টুন আঁকা বন্ধ করে দিতে হয়না। তার মতো যিনি দেশের ইয়াং জেনারেশনের সাথে সহজেই একাত্ম হতে জানেন, জনগণের পালস ঠিকঠাক বুঝতে পারেন বর্তমানে এরকম একজন নেতা প্রয়োজন।


২  

বিএনপি’র প্রথমসারির নেতৃত্ব বিশেষ করে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, শামসুজ্জামান দুদু, সালাউদ্দিন আহমেদ প্রমুখদের দলের উপদেষ্টামন্ডলীতে গিয়ে শলা-পরামর্শ করা কিংবা সক্রিয় রাজনীতি থেকে একেবারে অবসর নেয়ার সময় এসেছে বলে মনেকরি। আর কত! ওনারা দেশের জন্য অনেক করেছেন, এবার ওনাদের বিশ্রাম নেয়া দরকার। শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, রুমিন ফারহানা, ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, শামা ওবায়েদ, নাসির উদ্দিন অসীম, ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল প্রমুখদের মতো বিএনপি’র তরুণ নেতাদের এখন সামনের কাতারে আসা উচিত। বিএনপি’র ছাত্র-যুব নেতাকর্মীরা ৩৬ জুলাইয়ের আন্দোলনে রক্ত দিয়েছেন, সিনিয়র নেতারা জেলে ছিলেন। কিন্তু তারা জেলখানার উঁচু দেয়ালের এপারে রাজপথের আন্দোলনে ব্যস্ত জনগণের মনোজগতে পরিবর্তনের খবর রাখেননি। তাদের কণ্ঠে তাই পুরনো সুর, তারা এখনও আগের ভাষায় কথা বলছেন। বিগত কয়েক মাসে তাদের প্রলাপে মানুষ বিরক্ত, দল জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান এবং সিনিয়র নেতাদের মুখের ভাষা ভিন্ন। রক্তের এই হোলিখেলার পর আমরা আর ঔপনিবেশিক সুরে কথা শুনতে চাইনা। ৩৬ জুলাইয়ের পর এ এক অন্য বাংলাদেশ। বিএনপি’র সিনিয়র নেতারা দ্রুত নির্বাচন চান, আমরাও চাই কিন্তু তার আগে চাই কিছু দৃশ্যমান সংস্কার। যে সংস্কারের ওপরে নতুন বাংলাদেশ হাঁটতে-চলতে শিখবে।


৩  

জামায়াতে ইসলামকে নিয়ে কিছু বলছিনা কারণ তাদের সাথে একাত্তরের বিষয়টা এখনও মীমাংসিত না। তাদেরকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বাতাবরণে ঐ ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা না করে মুখোমুখি হয়ে এবং অবস্থান পরিষ্কার করেই রাজনীতির মাঠে আসতে হবে। নতুবা ভোটের ফলাফল ১০% এর নীচেই আটকে থাকবে। অন্যান্য ইসলাম বেচা রাজনৈতিক দলের বিষয়ে এদেশের জনগণ সিদ্ধান্ত নিবে। নতুন দল এনসিপিকে নিয়ে লেখার সময় এখনও আসেনি। তাদের চেয়েও অধিক মেধা, গুণগত মানসম্পন্ন নেতৃত্ব এবং দেশের জন্য অগাধ ভালোবাসা নিয়ে জাসদ একসময় এদেশের রাজনীতিতে এসেছিল কিন্তু তারা এখন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। গোপন সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং রাজনৈতিক তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খান, মেজর মোহম্মদ আব্দুল জলিল (অবঃ), আ স ম আবদুর রবের মতো নেতৃত্ব তাদের ভাঙ্গন ঠেকাতে পারেনি।


এনসিপি’র ভবিষ্যৎ জাসদের মতো হোক তা চাইনা তবে এনসিপি’র শুরুটা প্রশ্নবোধক চিহ্নের মাধ্যমে হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম কামাল (অবঃ) এর ‘জনতার দল’ জাতীয় পার্টিকে পুনর্বাসন করা ছাড়া আরকিছু করতে পারবে বলে মনে করি না। তাদেরকে বিএনপি’র জাতীয়তাবাদী কনসেপ্ট হ্যাক না করে নিজেদের রাজনীতির ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে হবে। তা না হলে তাদের অবস্থা কর্ণেল অলি আহমেদ (অবঃ) এর লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, ড. ফেরদৌস আহমেদ কোরেশি’র প্রগ্রেসিভ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি কিংবা মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম (অবঃ) এর কল্যাণ পার্টি’র মতোই হবে। আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়েই আসতে হবে। তাদের গুম-খুন-হত্যার রাজিনীতি এবং অর্থপাচার ফৌজদারি অপরাধ। প্রথমত আদালতেই নির্ধারিত হোক এই পার্টির ভাগ্য এবং তাদের সাথে জড়িত সামরিক-অসামরিক-রাজনৈতিক নেতাদের ভবিষ্যৎ। বিচারিক প্রক্রিয়া এবং শাস্তিভোগের শেষে এদেশের জনগণ তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে। আডলফ হিটলারের ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি বা নাৎসি পার্টি এখনও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামীলীগ ৩/৪ উপদলে বিভক্ত হয়। শেখ হাসিনার অবর্তমানে আওয়ামী লীগ কতোটা উপদলে বিভক্ত হয় তা এখন দেখার বিষয়। বয়স শুধু বেগম খালিদা জিয়ার না, শেখ হাসিনারও বাড়ছে, এটা মনে রাখতে হবে।


৪ 

এই মুহুর্তে দেশের অধিকাংশের যেটা দাবী, রাষ্ট্রীয় সংস্কার। নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার শেষে দেশে একটা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক। সেই নির্বাচনে নিজের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে বিএনপি দেশের ক্ষমতায় আসুক, দেশ ও জনগণের কল্যাণে সরকার গঠন করুক সেটা চাই। সেই সরকারে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হোন, তবে বিএনপি যেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করে নতুন বাংলাদেশের পথচলা শুরু করে সেটাও চাই। তারেক রহমানের তরুণ-বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, দেশভাবনা, দূরদর্শিতা এবং প্রফেসর ইউনূসের প্রজ্ঞা-মেধা ও আন্তর্জাতিক কানেকশনের ছায়াতলে আগামীর বাংলাদেশ হোক সুখী ও সমৃদ্ধশালী। ধন্যবাদ।



পোস্ট ভিউঃ 11

আপনার মন্তব্য লিখুন