সবার সাথে বন্ধুত্ব থেকে কৌশলগত ভারসাম্য: একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পুনর্মূল্যায়ন

লেখালোক সমসাময়িক বিষয়
সবার সাথে বন্ধুত্ব থেকে কৌশলগত ভারসাম্য: একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পুনর্মূল্যায়ন

১ 

১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতিটি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার ঢাল হলেও ২০২৬ সালের জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর কৌশলগত সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শান্ত সমীকরণে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন আমেরিকা ও চীনের মতো পরাশক্তিদের বহুমাত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ব্যাপক সামরিকায়নের পথে এক রণক্ষেত্র। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে কেবল আদর্শিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যার প্রমাণ হিসেবে সুইজারল্যান্ড বা জাপানের মতো দেশগুলোর সাম্প্রতিক সামরিকীকরণের দিকে ঝোঁকার উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। তাই বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জিডিপির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি করা এখন বিলাসিতা নয়, বরং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ। বিশেষ করে তুরস্কের মতো উদীয়মান সামরিক শক্তি, পাকিস্তানের সাথে কৌশলগত সমন্বয় এবং আমেরিকার উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি বহুমুখী প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশের উচিত হবে কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্লকে আবদ্ধ না হয়েও নিজের জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন মুসলিম দেশ ও সমমনা রাষ্ট্রগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। মূলত বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে নিজের কৌশলগত গুরুত্ব ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে ‘নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতা’ ত্যাগ করে ‘সক্রিয় প্রতিরক্ষা’ ও ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ নীতি গ্রহণ করাই হবে একবিংশ শতাব্দীর স্মার্ট কূটনীতি। এই পথ অনুসরণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারবে।


পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা ও নিরপেক্ষতার অবসান।


বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ‘নিরপেক্ষতা’র ধারণাটি দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে, যার স্পষ্ট উদাহরণ হলো সুইজারল্যান্ডের মতো ঐতিহাসিকভাবে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ন্যাটোর দিকে ঝুঁকে পড়া এবং জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শান্তিবাদী দেশগুলোর নজিরবিহীন সামরিক আধুনিকায়ন। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকা ও চীনের প্রভাব বিস্তারের লড়াই বিশ্বকে নতুন করে মেরুকরণ করেছে, যার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এমতাবস্থায় কেবল ‘কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নামক ঐতিহ্যগত তত্ত্বে সীমাবদ্ধ থাকা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের কৌশলগত শূন্যতা তৈরি করতে পারে, কারণ আজকের বিশ্বে নিষ্ক্রিয়তা অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে গণ্য হয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সংকটের মুহূর্তে নিরপেক্ষ থাকা সবসময় ফলপ্রসূ হয় না; যেমনটি জর্জ ডব্লিউ বুশ ৯/১১ পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, ‘Either you are with us, or you are with the terrorists,’ যা ছোট দেশগুলোকে পক্ষ নিতে বাধ্য করার এক চরম উদাহরণ। বাংলাদেশকেও আজ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়াতে হচ্ছে যেখানে নীরব থাকা ভুল বার্তার জন্ম দিতে পারে এবং জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করতে পারে। তাই সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত রাখতে হলে কেবল মুখে নিরপেক্ষতা নয়, বরং প্রয়োজন  কৌশলগতভাবে সঠিক মিত্র বাছাই এবং একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করা। সময়ের প্রয়োজনে নিরপেক্ষতার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে সক্রিয় ও ভারসাম্যপূর্ণ সামরিক কূটনীতি গ্রহণ করাই হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। একটি শক্তিশালী সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থানই নিশ্চিত করবে যে বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির চাপে পিষ্ট না হয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারে। আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে ‘সক্রিয় নিরপেক্ষতা’র নতুন সংজ্ঞায় বাংলাদেশকে সজ্জিত হতে হবে।


প্রতিরক্ষা বাজেট ও জিডিপির সামঞ্জস্য।


বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান শক্তি হিসেবে স্বীকৃত, যা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এক মজবুত ভিত্তি তৈরি করেছে। একটি দেশের জিডিপির ক্রমাগত প্রবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি করা এখন কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি ও এর ‘ব্লু ইকোনমি’ থেকে সর্বোচ্চ সুফল পেতে এবং সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা করতে নৌ-বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। একইসাথে আকাশসীমার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চতুর্থ বা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ও আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারত তাদের জিডিপির প্রায় ২.৪%, পাকিস্তান প্রায় ৩.৮% এবং মিয়ানমার প্রায় ৩% এর বেশি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করে, যেখানে বাংলাদেশের বরাদ্দ এখনো জিডিপির ১.২% এর আশেপাশে সীমাবদ্ধ। একটি শক্তিশালী ও আধুনিক সামরিক বাহিনী মূলত ‘ডিটারেন্স’ হিসেবে কাজ করে, যা সম্ভাব্য যেকোনো বহিঃশক্তির আগ্রাসন থেকে দেশকে সুরক্ষা দেয়। বর্তমানের অস্থিতিশীল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামরিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানেই জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। তাই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সমান্তরালে শক্তিশালী সামরিক কাঠামো গড়ে তোলা হলে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ‘বারগেইনিং পাওয়ার’ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। পরিশেষে, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে জিডিপির একটি নির্দিষ্ট ও সম্মানজনক অংশ প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ করা স্মার্ট বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখন সময়ের দাবি।


কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও সামরিক জোটের প্রয়োজনীয়তা।


বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই একাকী পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব, তাই আধুনিক সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর হতে কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিকল্প নেই। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে নির্দিষ্ট কিছু শক্তিশালী ও সমমনা রাষ্ট্রের সাথে সামরিক সম্পর্ক গভীর করা প্রয়োজন। নিচে এ সংক্রান্ত প্রধান অংশীদারদের ভূমিকা আলোচনা করা হলো:


ক। তুরস্ক ও প্রতিরক্ষা স্বনির্ভরতা।

বর্তমান বিশ্বে তুরস্ক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে এক বিস্ময়কর বিপ্লব ঘটিয়েছে, বিশেষ করে তাদের তৈরি ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তুরস্ক কেবল একটি বন্ধুপ্রতিম দেশই নয়, বরং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির এক নির্ভরযোগ্য উৎস এবং ‘ডিফেন্স ফোর্সেস গোল-২০৩০’ বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান সহযোগী। ড্রোন প্রযুক্তি থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, গাইডেড মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম এবং নৌ-বাহিনীর আধুনিকায়নে তুরস্কের সাথে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চুক্তি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ‘গেম-চেঞ্জার’ হতে পারে। এই অংশীদারিত্বের সবচেয়ে বড় দিক হলো প্রযুক্তি বিনিময় বা ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’, যা বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে দেশীয়ভাবে উন্নত মানের সমরাস্ত্র উৎপাদনে সক্ষম করে তুলবে। এছাড়াও ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র হওয়ার সুবাদে তুরস্কের কাছ থেকে পশ্চিমা মানের প্রযুক্তি পাওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমা অবরোধ বা রাজনৈতিক শর্তের চাপমুক্ত থাকার সুযোগ রয়েছে।


খ। আমেরিকা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা।

ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত গুরুত্ব বজায় রাখতে এবং একটি স্থিতিশীল নিরাপত্তা কাঠামো নিশ্চিত করতে আমেরিকার সাথে উন্নত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে আমেরিকার সাথে নিয়মিত যৌথ প্রশিক্ষণ, উচ্চতর সামরিক শিক্ষা এবং কাউন্টার-টেররিজম বিষয়ক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আন্তর্জাতিক পেশাদার মানদণ্ডে উন্নীত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এছাড়া সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা এবং মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় মার্কিন প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম বাংলাদেশের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। জিএসওএমআইএ (GSOMIA) বা এসিএসএ (ACSA) এর মতো প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর মাধ্যমে উন্নত সংবেদনশীল প্রযুক্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ঢাকাকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে।


গ। চীন ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা।

বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নের ইতিহাসে চীন দীর্ঘকাল ধরে সবচেয়ে বড় এবং সাশ্রয়ী প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎস হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে চীন থেকে কেবল সাধারণ সমরাস্ত্র কেনায় সীমাবদ্ধ না থেকে সম্পর্কটিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে উচ্চতর এবং সংবেদনশীল প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে সাবমেরিন, যুদ্ধজাহাজ এবং মিসাইল সিস্টেমের মতো কৌশলগত সক্ষমতা অর্জনে চীনের কারিগরি সহায়তা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছে। তবে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেইজিংয়ের সাথে এই সম্পর্ককে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা আসে এবং একক কোনো দেশের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এড়ানো যায়।


ঘ। পাকিস্তান ও আঞ্চলিক সমীকরণ।

দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূ-রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পাকিস্তানের সাথে পেশাদার সামরিক সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণে পাকিস্তানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং তাদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে। বিশেষ করে STP’র মতো মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সামরিক ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ় করার পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ দমন এবং পার্বত্য অঞ্চলের যুদ্ধকৌশল (Mountain Warfare) বিনিময়ে উভয় দেশ একে অপরকে সহায়তা করতে পারে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে এই সম্পর্ক ঢাকাকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং দর কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।


কৌশলগত ভারসাম্য: নিরপেক্ষতা থেকে সক্রিয়তায়।


একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের টিকে থাকার মূলমন্ত্র হবে ‘কৌশলগত ভারসাম্য’, যা নিষ্ক্রিয়তা ভেঙে সক্রিয়তার দিকে ধাবিত হবে। কৌশলগত ভারসাম্য মানে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে অন্ধভাবে যোগ দেয়া নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করা। এর সম্ভাব্য রূপরেখা নিচে আলোচনা করা হলো:


ক। সক্রিয় কূটনীতি।

আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক সংকটে কেবল নীরব দর্শক বা নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষ না থেকে, বর্তমানের জটিল বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশকে নিজের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে সাহসী এবং যৌক্তিক অবস্থান নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের উদাহরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; দেশটি যেভাবে ন্যাটোর সদস্য হয়েও নিজস্ব জাতীয় স্বার্থে রাশিয়া, ইউক্রেন বা মধ্যপ্রাচ্য সংকটে মধ্যস্থতাকারী এবং প্রভাবশালী পক্ষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তা বাংলাদেশের জন্য একটি আদর্শ মডেল হতে পারে। সক্রিয় কূটনীতি অনুসরণ করলে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর কেবল জোরালোই হবে না, বরং পরাশক্তিগুলোর সাথে কৌশলগত দরকষাকষিতে ঢাকাকে এক সুবিধাজনক ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে রাখবে। নিজের ভৌগোলিক গুরুত্বকে পুঁজি করে জাতীয় স্বার্থে ‘ইনিশিয়েটিভ’ বা উদ্যোগ গ্রহণ করলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রভাব দুই-ই বৃদ্ধি পাবে। পরিশেষে, সময়ের প্রয়োজনে সঠিক সময়ে সঠিক অবস্থান গ্রহণ করাই হবে স্মার্ট বাংলাদেশের আগামীর পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি।


খ। অস্ত্রের বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা।

সামরিক সরঞ্জামের জন্য একক কোনো দেশের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। ভেনেজুয়েলা নির্দিষ্ট কিছু উৎসের ওপর নির্ভরশীল থাকায় ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সময় খুচরা যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তাদের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। এই ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশকে তুরস্কের অপরাজেয় ড্রোন প্রযুক্তি, চীনের শক্তিশালী অবকাঠামোগত ভিত্তি এবং আমেরিকার উন্নত ইলেকট্রনিক্স ও সামরিক প্রশিক্ষণের মতো বহুমুখী উৎস কাজে লাগিয়ে একটি ‘হাইব্রিড’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অস্ত্রের উৎসে এই বৈচিত্র্য কেবল প্রযুক্তিগত স্বাধীনতাই নিশ্চিত করবে না, বরং যেকোনো বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মুখেও দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অচল হওয়া থেকে রক্ষা করবে। পরিশেষে, বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অর্জিত এই সামরিক স্বনির্ভরতাই হবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান কৌশলগত ভিত্তি।


গ। আঞ্চলিক নেতৃত্ব ও বঙ্গোপসাগরীয় প্রভাব।

বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি ও এর আকাশসীমায় নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখতে নৌ ও বিমান বাহিনীকে আধুনিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। যখন বাংলাদেশ সামরিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শক্তিশালী হবে, তখনই প্রতিবেশী দেশ ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো বাংলাদেশকে কেবল একটি উদীয়মান রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং এই অঞ্চলের এক অনিবার্য ‘কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে গণ্য করতে বাধ্য হবে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা একটি বড় উদাহরণ; ভৌগোলিক প্রতিকূলতা ও সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা দেশটিকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে একটি অপরিহার্য শক্তিতে পরিণত করেছে। একইভাবে, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলা হলে তা আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে ঢাকাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। পরিশেষে, আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজের নেতৃত্বের অবস্থান সুসংহত করতে একটি সুসজ্জিত ও আধুনিক সামরিক কাঠামোই হবে বাংলাদেশের প্রধান কৌশলগত শক্তি।


ঘ। সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ।

সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ হিসেবে ‘সক্রিয় প্রতিরক্ষা অবস্থান’ বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী ‘ডিটারেন্স’ বা কৌশলগত প্রতিবন্ধক তৈরি করবে, যা যেকোনো বহিঃশক্তির সম্ভাব্য আগ্রাসনকে গোড়াতেই প্রতিহত করার সক্ষমতা রাখে। বর্তমানের অস্থির ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় কেবল কূটনৈতিক সদিচ্ছা দিয়ে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা অসম্ভব; বরং সামরিক শক্তিমত্তার উপস্থিতিই প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা শক্তিশালী দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব ও অখণ্ডতার বার্তা পৌঁছে দেবে। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে হলে তার সম্পদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য, যার প্রধান স্তম্ভ হবে এই আধুনিক ও সক্রিয় সামরিক নীতি। এটি কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়, বরং শান্তির গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করবে, যেখানে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতাই হবে আন্তর্জাতিক মহলে তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ও সার্বভৌমত্বের প্রকৃত ঢাল। মূলত, একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামোর মাধ্যমেই বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।


৬  

সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতিটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি সুদৃঢ় নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে চিরকাল সমাদৃত হবে, তবে বর্তমান বিশ্বের জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এটিই একমাত্র কৌশল হতে পারে না। একবিংশ শতাব্দীর বাস্তব রাজনীতি অত্যন্ত নির্মম; এখানে শক্তিমত্তার অভাব থাকলে নিরপেক্ষতা অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে গণ্য হয়। চীন ও আমেরিকার চলমান বৈশ্বিক ক্ষমতার লড়াই কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অস্থিরতার মাঝে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে ঢাকাকে তার পররাষ্ট্রনীতিতে আরও সাহসী ও প্রো-অ্যাক্টিভ হতে হবে। কেবল কূটনৈতিক বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত মিত্রতার মাধ্যমে নিজেদের একটি অপরিহার্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এখন সময়ের দাবি।


স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সমান্তরালে একটি অভেদ্য প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলা অপরিহার্য। শক্তিশালী অর্থনীতি যেমন দেশের মেরুদণ্ড, তেমনি আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হলো সেই অর্থনীতির রক্ষাকবচ। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় কোনো বিশেষ ব্লকের ক্রীড়ানক না হয়েও তুরস্ক, আমেরিকা বা চীনের মতো শক্তির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও সামরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা। সার্বভৌমত্ব রক্ষা কেবল সীমান্তের পাহারা নয়, বরং আন্তর্জাতিক মহলে নিজের ‘বারগেইনিং পাওয়ার’ বা দরকষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধির নাম। জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে রেখে একটি শক্তিশালী সামরিক ও কূটনৈতিক কাঠামোর সমন্বয়ই হবে আগামীর বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত রক্ষাকবচ। 



পোস্ট ভিউঃ 11

আপনার মন্তব্য লিখুন