১
বাবু সালাম বারে বার
আমার নামটি গয়া বাইদ্যা বাবু
বাড়ি পদ্মার পাড়
বাবু সালাম বারে বার।।
মোরা এক ঘাটেতে রান্ধিবাড়ি
মোরা আর এক ঘাটে খাই
মোদের সুখের সীমা নাই।।
কবি জসীম উদ্দিনের এই বিখ্যাত পল্লীগীতিতে বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। গানের বেদে বা বাইদ্যারা আসলে বাংলাদেশের একটি পেশাভিত্তিক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। প্রান্তিক যাযাবর গোষ্ঠীর ভূমিহীন এই মানুষেরা দলবদ্ধভাবে নৌকাতে বাস করে। এজন্য তাদের জলের জিপসিও বলা হয়। সাপের খেলা দেখানোর জন্যই এরা বেশি জনপ্রিয়। বেদেদের বাদিয়া, বাইদ্যা বা বইদ্যানী নামে ডাকার কারণ প্রাচীনকাল থেকেই এরা কবিরাজি, ঝাঁড়ফুঁকসহ বিভিন্ন হাতুড়ে চিকিৎসার সাথে জড়িত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বেদেনীদের পেশা সম্পর্কে বলেন- বেদেনীরা সাপ, ছাগল ও বাঁদর নিয়ে ডুগডুগি বিষম-ঢাকি বাজিয়ে বাড়ি বাড়ি হেঁকে বেড়ায় এবং তিনি ছন্দময় বাক্যে বেদেনীর কন্ঠে প্রকাশ করেছেন-
বেদেনীর খেলা দ্যাখেন গা মা বাড়ির গিন্নী,
রাজার রানী, স্বামী-সোহাগী, সোনা কপালী চাঁদের মা।
কাল নাগিনীর দোলন নাচন হীরেমনের খেলা।
অনেকে দাবী করেন, বেদে শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে বেদুইন থেকে। আরব বেদুইনদের বেদেরা পরিচয় দেয় নিজেদের পূর্বপুরুষ হিসেবে। তবে নৃতাত্ত্বিক বিবেচনায় কিন্তু বেদেরা অনার্য। ডঃ সমরেন্দ্রনাথ মল্লিক বলেন, ‘এরা অনার্য। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংস্পর্শে আসায় কিছু কিছু আর্যধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাব এদের মধ্যে পড়েছে। কিন্তু প্রকৃতি ধর্মে, বেশভূষায়, আচরণে এরা এখনও সেই আদিম বন্যস্তরের। এরা নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। সাপ খেলা দেখায়, বিভিন্ন ভেষজ বৃক্ষের শিকড় বিক্রি করে।’ তাদের মধ্যে আসলে আরবদের সেমিটিক কোনো বৈশিষ্ট্যই নেই। ডঃ অতুল সুর মনে করেন, ‘বাংলায় আদি অস্ট্রাল ও ভূমধ্যসাগরের সংমিশ্রণেই এদেশের নৃতাত্ত্বিক বুনিয়াদ গঠিত হয়েছে। অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে বেদে সম্প্রদায়টিও সংমিশ্রণেরই অন্তর্ভুক্ত।’ বেদেরা সুঠাম দেহ, গভীর কালো গায়ের রঙ, কোঁকড়ানো চুল, আয়ত ও কালো চোখের অধিকারী। শারীরিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তারা আসলে আদি অস্ট্রাল বংশোদ্ভূত।
তাদের এদেশে আসা নিয়ে অবশ্য অনেক ধরনের তত্ত্ব প্রচলিত আছে। কারও মতে, তারা আরাকানের মনতং মান্তা নৃগোত্র থেকে এসেছে। কেউ বলে থাকেন, বেদেরা সাঁওতালদের বিচ্ছিন্ন অংশ। যারা পারস্যের সাথে বেদেদের সম্পর্ক খোঁজেন, তাদের মতে, বেদেরা সাত শতকে আরবের আলবাদিয়া নামক স্থান থেকে এদিকে এসেছে। অনেকের ধারণা, খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে পূর্ব ভারত থেকে বেদেরা সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং কালক্রমে এ অঞ্চলে আসে। ডঃ অসীতবরণ পালের মতে, ‘ব্রাহ্মণ্যবাদে নিপীড়িত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বৈরী পরিস্থিতিতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য পরিবার পরিজন নিয়ে নৌকায় আশ্রয় গ্রহণ করে এবং শেষ পর্যন্ত কয়েকশ বছর তারা নৌকায় কাটানোর ফলে তারা আর নৌজীবন ত্যাগ করতে পারেনি।’
প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৬৩৮ সালে বেদেরা আরাকান রাজ বল্লাল রাজার সাথে এ দেশে আসার পর বিক্রমপুরে প্রথম বসতি গড়ে তোলে। পরে সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে। বাংলাদেশের বগুড়া, পাবনা, ময়মনসিংহ, বাখরগঞ্জ, নোয়াখালিতে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষদের পাওয়া যায়। সাভার, মুন্সীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, গাজীপুরের জয়দেবপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, মিরসরাই, তিনটুরী, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চান্দিনা, এনায়েতগঞ্জ, ফেনীর সোনাগাজী ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বেদেদের আবাসের কথাও জানা যায়। উল্লেখ্য, সাভারে যে বিশাল প্রান্তিক গোষ্ঠী রয়েছে, তাদের অধিকাংশ নিজেদের মান্তা বলে পরিচয় দেয়। মান্তারা পেশায় মৎস্যজীবী। এদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মাচার বেদেদের মতোই।
তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় এর ছোটগল্প ‘বেদেনী’তে বেদেদের বৈচিত্রময় জীবনধারার কাহিনী ফুটে উঠেছে-
“বিচিত্র জাত বেদেরা। জাতি জিজ্ঞাসা করিলে বলে, বেদে। তবে ধর্মে ইসলাম। আচারে পুরা হিন্দু; মনসাপূজা করে, মঙ্গলচন্ডী, ষষ্ঠীর ব্রত করে, কালী-দুর্গাকে ভূমিষ্ট হইয়া প্রণাম করে। হিন্দু পুরাণ-কথা ইহাদের কন্ঠস্থ। বিবাহ আদান প্রদান সমগ্রভাবে ইসলাম-ধর্ম সম্প্রদায়ের সঙ্গে হয় না, নিজেদের এই বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যেই আবদ্ধ। বিবাহ হয় মোল্লার নিকট ইসলামীয় পদ্ধতিতে, মরিলে পোড়ায় না কবর দেয়।”
সমাজকল্যাণ দপ্তরের জরিপ মতে, বাংলাদেশে শতকরা ৯৯ ভাগ বেদে মুসলিম। বেদেদের ধর্মাচার অবশ্য মিশ্র। অনেকে পীরের অনুসারী, আবার কেউ কেউ মনসা বা বিষহরির ভক্ত। ধর্মে সাধারণত বেদেদের আগ্রহ নেই। হিন্দু দেবদেবীর প্রশস্তি রচনা, বিভিন্ন পার্বণে অংশ নিলেও বেদেরা পূজা অর্চনা করে না। বাঙালি মুসলমানদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক নেই বললেই চলে। বিবাহ মুসলিম ধর্মীয় মতে হলেও বিবাহে বিভিন্ন রীতিনীতি আছে। গোষ্ঠীভেদে এসব রীতিনীতির পার্থক্য দেখা যায়। আগের দিনে মারা গেলে তাদের লাশ কলাগাছের ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হতো। এখনও তাদের মৃতদেহের ঠাঁই হয় কোনো পরিত্যক্ত স্থানে কিংবা নদীর কিনারায়।
২
বেদেরা কৌমসমাজের রীতি পালন করে আসছে শুরু থেকেই। তাদের জীবনযাত্রা, সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন গোত্রের মধ্যেই আবদ্ধ। প্রতিটি বেদে পরিবারের আছে নিজস্ব নৌকা। কয়েকটি নৌকা নিয়ে তৈরি হয় একটি দল। আর কয়েকটি দল নিয়ে একেকটি বহর। প্রতিটি বেদে বহরে একজন সর্দার থাকেন। বহরের নিয়মনীতি, প্রত্যেক দলের বাণিজ্যপথ ও এলাকা এসবই নির্ধারণ করেন সর্দার। বেদে সম্প্রদায়ের উপগোত্রীয় ও গোত্রীয় সর্দারও আছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের তথ্যানুযায়ী, বেদেরা ৮টি গোত্রে বিভক্ত। এই গোত্রগুলো হলো মালবেদে, সাপুড়িয়া, বাজিকর, সান্দার, টোলা, মিরশিকারী, বরিয়াল সান্দা ও গাইন বেদে।
বেদেরা বাঙালিদের সাথে বাংলায় কথা বললেও তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। নিজেদের মধ্যে তারা ঠেট বা ঠার ভাষায় কথা বলে থাকে। আগেই বলা হয়েছে, বেদেরা অস্ট্রালগোত্রীয়। কিন্তু তাদের ভাষা তিব্বতি-বর্মি (সাক-লুইশ) ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এ ভাষার কোনো লিপি নেই। ভারতীয় উপমহাদেশে বর্তমানে যেসব ভাষা চালু আছে ভাষাতাত্ত্বিকেরা সেসব ভাষাকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। এগুলো হলো- ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার, দ্রাবিড় ভাষা পরিবার, অস্ট্রিক ভাষা পরিবার বা অস্ট্রোএশিয়াটিক এবং তিব্বতীয় চৈনিক ভাষা। এই তিব্বতীয় চৈনিক ভাষা পরিবার আবার দুই ভাগে বিভক্ত, তিব্বতি বর্মি এবং চিনা থাই। তিব্বতি বর্মি আবার দুই ভাগে বিভক্ত, ভোট-পাহাড়ি এবং আসাম-বার্মিজ। এই আসাম-বার্মিজের একটি শাখা হলো সাক-লুইস, এই শাখার অন্তর্গত হলো ঠার এবং চাক ভাষা। ১৯৯১ সালের হিসাব অনুযায়ী ঠারভাষী বাংলাদেশি বেদের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। উল্লেখ্য, এই ঠার বা ঠেট ভাষার সাথে আরাকানিদের ভাষার প্রভূত মিল আছে। তাদের ভাষায় ব্যবহূত অধিকাংশ শব্দই বাংলা ভাষার আদিরূপ প্রাকৃত থেকে উদ্ভূত।
বেদেরা উপমহাদেশের প্রাগৈতিহাসিক কালপর্ব থেকে যে এদেশের ভূমিজ, তার প্রমাণ রয়েছে প্রাচীন সব সাহিত্যে। আদি অস্ট্রালয়েডদেরকেই বৈদিক সাহিত্যে অনার্য বলে অভিহিত করা হয়েছে। বৃহদ্ধর্ম পুরাণে এই জনগোষ্ঠীকে ৪১ টি উপবর্ণে বিভক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে যারা একদম অধম, তাদের বলা হয়েছে অন্ত্যজ। এদের সংখ্যা ৯টি, যথা- চণ্ডাল, চর্মকার, ডোলবাহী, মলেগ্রহী, বাউড়ি, মালো, তক্ষ ও ঘট্টজীবী। ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরানে শূদ্রের নিম্ন পর্যায়ের অন্ত্যজ হিসেবে আছে ব্যাধ, ভড়, কাপালি, কোল, কোঞ্চ, হাড়ি, ডোম, জোলা, বাগতীত, শরাক, ব্যালগ্রাহী। এই ব্যালগ্রাহীরাই হলেন সাপুড়ে। বিখ্যাত কবি উমাপতিধর বিজয় সেন থেকে শুরু করে লক্ষণ সেন এর রাজকবি ছিলেন। সদুক্তিকর্নামৃতে উমাপতিধরের ৯১টি শ্লোক আছে। তার একটি এরকম-
ক্ষুদ্রাস্তে ভূজগাঃ শিরাংসি নময়ত্যাদায় যেষামিদং
ভ্রাতর্জাঙ্গলিক ত্বদাননমিলন্মন্ত্রানুবিন্ধং রজঃ।
জীর্নস্তেষফণীন যস্য কিমপি ত্বাদৃগগুণীন্দ্রব্রজা-
কীর্ণক্ষ্মাতলধাবনাদপি ভজত্যানম্রভাবং শিরঃ।
অর্থাৎ ভাই জাঙ্গলিক (সাপুড়ে), তোমার এই সাপগুলো ছোট ছোট, তোমার মুখের মন্ত্রপড়া ধূলি এদের মাথা নিচু করে দিচ্ছে। এই ফণাতোলা সাপটি মনেহয় জীর্ণ অর্থাৎ প্রবীণ, কেননা তোমার মতো গুণী দ্বারা পূর্ণ মাটিতে ধারণ করেও এর মাথা নত হচ্ছেনা।
৩
প্রাচীনকালে তারা রাজপুরুষের মর্যাদা পেতো বলে জানা যায়। তাদের মৌখিক সংস্কৃতিও বেশ ঋদ্ধ ছিলো। বেদেদের রয়েছে নিজস্ব বস্তুগত ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নিজস্ব বিবাহ সংস্কার, গান, লোক সাহিত্য, চিকিৎসা পদ্ধতি আর ভাষা। বেদেদের গানের সুর থেকে সৃষ্টি হয়েছে সঙ্গীতের বিশেষ রাগ, যার নাম মালকোষ। কোনো একসময় তারা সামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় প্রতিকূলতার জন্যই হয়তো ঘরবাড়ির মায়া ছেড়ে বাধ্য হয় যাযাবর জীবন বেছে নিতে। তারপর থেকে শত শত বছর ধরে নদীর জীবনে অভিযোজিত হয়ে আজও তারা টিকে আছে এই ভূমিতে। সময়ের আবর্তে উন্নতির পরিবর্তে বেদে সমাজের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্দিন। নদীর রূপ বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাদের চলার পরিধি ছোট হয়ে আসছে। আর তাই তারা অনেকেই ছাড়তে শুরু করেছে নদী। নদী ছেড়ে কোথায় যাবে এসব বেদে। তাদের নেই কোনো শিক্ষা, নেই কোনো কাজের বিশেষ যোগ্যতা। এভাবেই বেদের জীবনের শেষ হয়ে যায়। বেদেরাই সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষ। নৌকাতেই তাদের জন্ম আর নৌকাতেই তাদের জীবন শেষ। আজও কান পাতলে গ্রাম-বাংলার পথে ঘাটে শোনা যায়, কারা যেন সুর করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা করছে-
সাপের খেলা দেখবেন গো, সাপের খেলা
এই দাঁতের পোকা উঠাই, পিঠের ব্যথা,
পেটের ব্যথা, হাঁটুর ব্যথায় শিঙ্গা লাগাই, শিঙ্গা-আ…
এই শিঙ্গা টানি, মাজা টানি, মাজা ব্যথা,
দাঁতের ব্যথা, দাঁতের পোকা ফেলাই-ই-ই……
তারা আসলেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে পারে কি! এই যাযাবর বেদে জনগোষ্ঠী আমাদের প্রতিবেশী, তাদের সম্পর্কে আমরা আসলে কতটুকু জানি ?
তথ্যসূত্র-
১। বাংলাদেশের বেদে জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়- রঞ্জনা বিশ্বাস
২। বংলাদেশের বেদে সম্প্রদায়- নাজমুন নাহার লাইজু
৩। বেদে জনগোষ্ঠীর ভাষাঃ উৎস ও তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য- রঞ্জনা বিশ্বাস
৪। বাংলাপিডিয়া
৫। ইন্টারনেট
পোস্ট ভিউঃ 7