যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের: রমণীর সাথে তার হয়েছিল দেখা

লেখালোক সাহিত্য এবং সংস্কৃতি
যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের: রমণীর সাথে তার হয়েছিল দেখা

মোড় ঘুরতেই নোয়ালে মাথা, আমি দেখলাম চুলের সিঁথি’,


কবি ফজল মাহমুদের লেখা কবিতার লাইনটা প্রেমিকা তাহমিনার উদ্দেশ্যে। কুমিল্লা শহরের ভিক্টোরিয়া কলেজ উচ্চমাধ্যমিক শাখার কান্দিরপাড়ের দিকের শতবর্ষি গেটের কাছে হুডতোলা রিক্সায় তাহমিনাকে দেখে তিনি কবিতাটা লিখেছিলেন। কবি ফজল মাহমুদ, কবি সৈয়দ আহমাদ তারেক এবং তাহমিনা, তারা তিনজনই কুমিল্লা নিবাসী। শান্ত স্বভাব, শ্যামলা বরণ এবং চোখে পাওয়ারফুল চশমার অধিকারী তাহমিনা কুমিল্লা বাগিচাগাঁও ফায়ার ব্রিগেডের আশেপাশে থাকতেন। তিনি পড়তেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলোসফি ডিপার্টমেন্টে। একইসাথে তার প্রেমে পড়েছিলেন দুই জিনিয়াস কবি, ফজল মাহমুদ এবং সৈয়দ আহমাদ তারেক। তাহমিনাকে ভার্সিটি এলাকায় কবি সৈয়দ আহমাদ তারেক এবং রোকেয়া হলে ফিরতেই গেটে কবি ফজল মাহমুদের পাগলামি সামলাতে হতো। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সৈয়দ আহমাদ তারেক তার কবিতা, গল্প এবং তাহমিনাকে নিয়ে পাগলামি, এসবের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাকে নিয়ে আতংকিত থাকতেন তাহমিনা, কবি তাকে নিয়ে লিখেছিলেন,


তাহমিনা, দশ হাত দূরেও দেখ না   

টাকা পয়সা ভালবাসা তাহমিনা


তাহমিনার জন্য কবির প্রেম একতরফা হলেও তা মধুর ক্যান্টিন, রেখায়নের আড্ডা এবং শামছুন্নাহার হলের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল।


মেধাবী কবি ফজল মাহমুদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে ঢাকায় গিয়েছিলেন। আনোয়ারুল হক ‘রেখায়ন’ বইয়ে তার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘কবি ফজল মাহমুদকে স্বাধীনতার আগে আমরা কেউ চিনতাম না, দেখিও নি। ৭২ পরবর্তী কোন একদিন আকর্ষণীয় একটি কবিতা সংকলন ‘জিবরাঈলের ডানা’ প্রকাশ করে ‘পেড়া ভাণ্ডারে’র আড্ডায় হাজির। তাৎক্ষণিক সে আমাদের প্রীতির জায়গাটা দখল করে নেয় এবং অবধারিত হয়ে যায় জ্যোৎস্নার প্রতিবেশি। এরপর ফজল মাহমুদ বের করে মানসম্পন্ন মাসিক কবিতা বিষয়ক পত্রিকা ‘চিরকুট’। একাধিক সংখ্যা বের করার পর ফজল মাহমুদ পড়ার জন্য ঢাকা চলে গেলে……।


ফজল মাহমুদ তার প্রেমিকা তাহমিনার চেয়ে বয়সে ছোট ছিলেন বলে শুরুতে ‘আপু’ বলেই সম্বোধন করতেন। তাহমিনাও তাকে ছোটভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। এভাবেই কাছে আসা এবং কবি একদিন প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বসেন। কবি সৈয়দ আহমাদ তারেক প্রেমে অতটা সিরিয়াস না হলেও কবি ফজল মাহমুদের কাছে বিষয়টা ছিল একেবারে ভিন্ন। ফজল মাহমুদ তার প্রেমের স্বীকৃতির জন্য তাহমিনাকে চাপ দিতে থাকেন কিন্তু তাহমিনা এই অসম প্রেম মেনে নেননি। প্রেমিকাকে কিছুতেই রাজী না করাতে পেরে একদিন রোকেয়া হলের গেটের সামনে শেষ বারের মতো স্বীকৃতি দিতে বলেন। তাহমিনা সেদিনও রাজী না হওয়ায় কবি ফজল তার সামনেই ব্যাগ থেকে এনড্রিনের বোতল বের করে ঢকঢক করে পান করেন।


প্রতিভা আর বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে কবি সৈয়দ আহমাদ তারেক সাহিত্যের জগতে পা রেখেছিলেন। অথচ তার মেধার দশ শতাংশ ব্যবহার করার আগেই অতিরিক্ত নেশায় ডুবে গিয়েছিলেন। প্রতিভার প্রতি সুবিচার করলে আজ তিনি হয়তো সাহিত্যের জগতে প্রথম কাতারেই থাকতেন। মদ, গাঁজা আর নেশার ওষুধ, মেনড্রাক্স তাকে শেষ করে দিয়েছে। আত্মহত্যা করে কবি ফজল মাহমুদ সেদিন তার প্রেমিকাকে মুক্তি দিয়েছিলেন আর কবি সৈয়দ আহমাদ তারেক হারিয়ে গিয়েছিলেন নেশার জগতে। দারুণ হ্যালোসিনেশনের কারণে তরুণ সমাজের প্রায় সবাই তখন মেনড্রাক্স জোয়ারে ভেসেছে। আর এটা নিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছিলেন কবিতা, রবিবারের গান,


আজ রোববার, আজ হলিডে 

আজ মেনড্রাক্স, শুধু মেনড্রাক্স  

আহা মেনড্রাক্স। আজ মাইসেলফ,  

আজ হু হু, আজ হো হো, 

আজ হাহ্‌ হা, আজ লাল্লা।


আজ চিয়ার আপ্‌, আজ রোববার, 

আজ হলিডে, আজ হরতাল, 

আজ চাকা বন্ধ। আজ হরতাল,

আজ হাহ্‌ হা, আজ মেনডাক্স।


আজ ভাটিয়াল গাঙের নাইয়া। 

আজ হুর রে। শুধু হুর রে। 

আগে জানলে? আগে জানলে তোর 

ভাঙা নৌকায় চড়তাম না,

হায় মেনডাক্স। আহা মেনডাক্স!


আজ হরতাল, আজ মেনডাক্স 

আজ হাহ্‌ হা, আজ হুর রে…।



তথ্যসূত্র: 

১। রেখায়ন- সম্পাদনায়: শওকত আহসান ফারুক, ফখরুল ইসলাম রচি, রেজা সেলিম 

২। রুম নাম্বার ১৪৬- শওকত আহসান ফারুক 

৩। কবিতা, অমীমাংসিত রমণী- নির্মলেন্দু গুণ



পোস্ট ভিউঃ 7

আপনার মন্তব্য লিখুন