১ বাঙালির সংস্কৃতি হলো ব্রীহি বা ধানের সংস্কৃতি। খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে জীবন যাপনের প্রতিটি পর্বে ধান বিভিন্ন ভাবে জড়িয়ে আছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি কবি, সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক ঈশ্বর গুপ্ত বলেছেন, ‘ভাত মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালি সকল।’ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে প্রাচীন বাঙলায় ধানের আমদানি হয়েছিল। চীন বা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য জায়গায় শুকনো মাটিতে ধানচাষ হলেও নিষাদ বাঙালি পানিতে ডোবানো জমিতে ধান চাষ করতো। চর্যাপদে চাল বা ভাতের কথা উল্লেখ আছে। আসলে এদেশের মানুষ সেই প্রাচীন কাল থেকেই ধান বা চালের তৈরি সাদা ভাত থেকে শুরু করে পোলাও-পিঠা-পায়েস বা বিভিন্ন রকমের মিষ্টান্ন প্রস্তুত করতে জানতো। যুগযুগ ধরে কবি-সাহিত্যিকদের রচনায় তার প্রমাণ মেলে। ১১৬৩-১১৭৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে শ্রীহর্ষ রচিত ‘নৈষধচরিত’ গ্রন্থে দয়মন্তীর বিবাহভোজের বিবরণে সমাজের উচ্চকোটির লোকেদের মাঝে দুগ্ধ ও অন্নপক্ক পায়েসের জনপ্রিয়তার কথা বলা হয়েছে (১৬/৭০)। মিষ্টি বা মিষ্টান্ন বাঙালির চিরদিনের পছন্দের খাবার। ভবদেব-ভট্টের প্রায়শ্চিত্ত-প্রকরণ গ্রন্থে নানারকম দুগ্ধপান সম্পর্কে যে কিছুকিছু বিধিনিষেধ তা মূলত স্বাস্থ্যগত কারণে। তবে দুধ, চালের গুঁড়ো, গুড় ইত্যাদির সাথে অন্যান্য উপকরন মিশিয়ে পিঠা-পায়েস জাতীয় মিষ্টান্নের কদর সবসময়ই ছিল। ১৭৮০-র দশকে গোলাম হোসেন সালিম তাঁর ‘রিয়াজ-উস-সালাতীন’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এ দেশের উঁচু-নিচু সবাই মাছ, ভাত, সর্ষের তেল, দই, ফল আর মিঠাই খেতে পছন্দ করে।’ এই মিঠাই কিন্তু রসগোল্লা না, এখানে মিঠাই বলতে পিঠা-পায়েসের কথা বলা হয়েছে। খেজুরের রস খাওয়া এবং খেজুরের রস থেকে গুড় ও পাটালি গুড় তৈরি করার ধারা বাঙালিদের মাঝে শত শত বছর ধরে প্রচলিত আছে। সেই সাথে আছে চালের গুঁড়োর সাথে নারকেল, গুড় এবং অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে পিঠা তৈরি করার ঐতিহ্য। বর্তমানে আমরা যে রসগোল্লা দেখি তা সাদা রঙের এক প্রকার ছানার মিষ্টি। এটি চিনি বা গুড় দিয়ে তৈরি হয়। ছানা (তার মধ্যে অনেক সময় সুজির পুর দেওয়া হয়) পাকিয়ে গরম রসে ডুবিয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়। জানা যায় যে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রথম রসগোল্লা প্রস্তুত করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার ফুলিয়ার হারাধন ময়রা প্রথম রসগোল্লা তৈরি করেছেন বলে দাবী করা হয়। এরপর এই রসগোল্লা জনপ্রিয় হয়ে নদীয়া থেকে কলকাতা ও ওড়িশায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে কলকাতায় এটি উল্লেখযোগ্যভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। কলকাতার নবীনচন্দ্র দাস আধুনিক স্পঞ্জ রসগোল্লার আবিষ্কর্তা ছিলেন। ১৯৩০ সালে নবীন চন্দ্রের পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র দাসের ভ্যাকুয়াম প্যাকিংয়ের প্রবর্তনের ফলে রসগোল্লার বিরাট বাজার পাওয়া যায়, যা কলকাতার বাইরে এবং পরবর্তীতে ভারতে বাইরে খাবারটি রপ্তানি করা সম্ভব হয়। অনেকে বলেন রসগোল্লার আদি উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চলে। বিশেষ করে, পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় পর্তুগীজদের সময় সেখানকার ময়রাগণ ছানা, চিনি, দুধ ও সুজি দিয়ে গোলাকার একধরনের মিষ্টান্ন তৈরি করেন যা ক্ষীরমোহন বা রসগোল্লা নামে পরিচিত। পরবর্তীতে বরিশাল এলাকার হিন্দু ময়রাগণের বংশধর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতা কিংবা ওড়িশায় বিস্তার লাভ করে। ১। বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব)- নীহাররঞ্জন রায় ২। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি- গোলাম মুরশিদ ৩। ইন্টারনেট
বিশিষ্ট বাঙালি সাহিত্যিক গোপাল হালদার ঠাট্টা করে এক জায়গায় বাঙালি সংস্কৃতিকে রসগোল্লা আর সন্দেশের সংস্কৃতি বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ঠাট্টা হলেও বাঙালিদের খাদ্য তালিকায় এই দুই বস্তুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যান্য অঞ্চলের লোকেরা এই দুই মিষ্টিকে বাঙালিদের মিষ্টি বলে শনাক্ত করেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় কয়েক শো বছর আগের বাংলা সাহিত্যে বর্তমান সময়ের মত জনপ্রিয় ছানার তৈরি সন্দেশ আর রসগোল্লার কোন উল্লেখ নেই। রসগোল্লার নাম তো নেই, সন্দেশের নাম থাকলেও তা দিয়ে আধুনিককালের সন্দেশ বোঝায় না। আত্মীয়ের বাড়ি থেকে পাঠানো খাজার মত মিষ্টিকেও সন্দেশ বোঝাতো। বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে বিশিষ্ট রম্য সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর বিখ্যাত রম্যগল্প ‘রসগোল্লা’ রচনা করেছেন। আমার এই লেখাও রসগোল্লার ইতিহাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
২
প্রাচীন কাল থেকেই এ অঞ্চলের লোকেরা পায়েস খেতেন, পিঠাও খেতেন। মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে নানা ধরনের মিষ্টি ও মিষ্টান্নের কথা জানা যায়। সেসময়ে যেসব মিষ্টান্ন জনপ্রিয় ছিল তার অনেকগুলোর নাম মধ্যযুগের সাহিত্য ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে পাওয়া যায়। এসবের মধ্যে ছিল অমৃত গুটিকা, আমের খণ্ড, কাঞ্জিবড়া, খিরিসা, ক্ষীরখণ্ড, ক্ষীরপুলি, ঘোল, চন্দ্রপুলি, ছানাবড়া, ছেনা, দই, দুগ্ধকুষ্মাণ্ড, দুগ্ধচিড়া, দুগ্ধতুম্বী, দুগ্ধলকলকি, নারিকেলপুলি, নালবড়া, পাতপিঠা, পানা, পায়স, পিঠা, পেঁড়া, বেসারি, মণ্ডা, মনোহরা, মাষ কলাই-এর বড়া, রসালা ইত্যাদি। এখানে উল্লেখিত ছানাবড়াকে বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাব্রতী, ভাষাতাত্ত্বিক ও শিশুসাহিত্যিক অধ্যাপক বিজনবিহারী ভট্টাচার্য রসগোল্লার পূর্বপুরুষ বলে অনুমান করেছেন। ঠিক কবে রসগোল্লার উদ্ভব হয় তা জানা যায়না। তবে ইংরেজদের আমল শুরু হবার আগেই যে রসগোল্লার আবির্ভাব ঘটেছিল তা নিশ্চিত। রসগোল্লার হেরফের ঘটিয়ে বাঙালি ময়রারা আরও নানা নামের মিষ্টি তৈরি করেছেন। যেমন- রাজভোগ, কাঁথির স্বরাজভোগ, রসগোল্লার চাটনি, কমলাভোগ, রসমালাই ইত্যাদি। আবার আজকাল বিভিন্ন ধরনের রসগোল্লা গুড়ের রসগোল্লা, কমলাভোগ, চকলেট রসগোল্লা, স্ট্রবেরি রসগোল্লা, আমের রসগোল্লা, আনারসের রসগোল্লা ইত্যাদি বিভিন্ন দোকানে তৈরি হয় প্রভাবের কারণে। রসগোল্লার শুকনো রূপের মধ্যে আছে দানাদার, ক্ষীরমোহন, চমচম ইত্যাদি।
৩
রসগোল্লা নিয়ে ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে বিরোধ ছিল। দুই রাজ্যের মানুষই দাবি করেছেন, তাদের রাজ্যেই এই মিষ্টির সন্ধান মিলেছে। ১৪ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রসগোল্লার জিআই ট্যাগ লাভ করে। ফলে রসগোল্লার উৎপত্তি যে বাংলায় তা প্রতিষ্ঠা পায়। সম্প্রতি ‘রসগোল্লা’ র উদ্ভব নিয়ে কলকাতায় একটা সিনেমা নির্মিত হয়েছে। সেটা ইতিহাস না ফিকশন সে বিতর্কে যাবো না, তবে সিনেমাটা বেশ ইন্টারেস্টিং। যারা প্রকৃত অর্থেই ‘রসগোল্লা’ প্রেমী তারা সিনেমাটা দেখতে পারেন। আর হ্যাঁ, রসগোল্লাকে ইংরেজিতে ‘Syrap Filled Roll’ বলা হয়।
হদিস:
পোস্ট ভিউঃ 12