বাঙলায় দাস ব্যবসার স্বরূপ

লেখালোক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য
বাঙলায় দাস ব্যবসার স্বরূপ

চারিদিকে চাহে বেউলা রাজঘাটে বসি।

জল ভরিবারে আইসে মনসার দাসী।।

একশত দাসী আইল বড়হী সুঠান।

নীলাবতী নামে দাসী সবের প্রধান।।


কবি বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল থেকে মধ্যযুগে দাসপ্রথার খন্ডচিত্র পাওয়া যায় এভাবে।


বাঙলার ইতিহাসে ১২০৬-১৭৬০ সাল পর্যন্ত সময়কে বলা হয় মধ্যযুগ। এযুগের রচিত ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকায়’, আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ কাব্যে, বিজয় গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে এবং মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে পর্তুগীজ ফিরিঙ্গি ও মগদের অত্যাচারের বিভীষিকা ও অরাজকতার কাহিনী বিশেষভাবে উল্লিখিত হয়েছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতীয় সমাজে দাসপ্রথার অস্তিত্ব ছিল। আর্যদের সময় হতে এই অঞ্চলে ক্রীতদাস করার রীতি প্রচলিত ছিল। আর্যরা বিজিত অনার্যদেরকে ক্রীতদাসে পরিণত করতে শুরু করে। মৌর্য যুগে এই ক্রীতদাসদের দিয়ে জমি চাষাবাদ করানো হতো। যদিও বাঙলা তথা ভারতবর্ষীয় দাসদের অবস্থা গ্রীক বা রোমের মত অতটা নির্মম ছিলনা তবুও সামন্তবাদী সমাজের একটি বিশেষ অঙ্গ বলে সীমিত পরিসরে হলেও দাসপ্রথার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। ভারতবর্ষে দাস-দাসীদের প্রতি অনেকটা উদার, মানবিক আচরণ করা হতো। কিছু দাসী ছিলো সখী পর্যায়ের, কবি ভারতচন্দ্র তার ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে যেমনটা লিখেছেন,


বিদ্যা বলে কেন হীরা       ইহা কহ ফিরা ফিরা

          সখীগণে তোমার কি ভয়।

মোর খায় মোর পরে        যাহা বলি তাহা করে

          মোর মত ছাড়া কভু নয়।।

যত সখীগণ কয়           কেন হীরা কর ভয়

           দাসী কোথা ঠাকুরানী ছাড়া।।


প্রাচীন কাল থেকেই বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলের পশ্চাৎপদ লোকজনদের মধ্যে, বিশেষ করে গ্রামের গরিব জনগোষ্ঠীর মধ্যে অভাব অনটনের কারণে উৎপাদন পদ্ধতিতে দাস প্রথার অস্তিত্ব দেখা দিতে শুরু করে। এমনকি দাস কেনা-বেচার বিষয়টিও ক্রমে প্রাধান্য পেতে থাকে। এদেশে সাধারণত যুদ্ধের জন্য সৈনিক, কৃষিকাজ ও গৃহভৃত্যের কাজে-কর্মে এসব দাস-দাসী ব্যবহার করা হতো। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে গৃহভৃত্য পর্যায়ের দাসের উল্লেখ পাওয়া যায়,


নাগারা নিশান ঘড়ি সংযোগ করিয়া।

কতগুলি লোক যোগ্য চাকর রাখিয়া।।


সাধারণভাবে যুদ্ধ বন্দি, উপহার হিসেবে প্রাপ্ত এবং ক্রয়সূত্রে দাস-দাসী সংগ্রহ করা হতো। অনেক সময় দরিদ্র পিতামাতারা সন্তানদের ক্ষুধা নিবারণে ব্যর্থ হয়ে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিত। ৭৬ ও ৪৩ সালের মন্বন্তরেও এরকম চিত্র দেখা গেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নমুনা’ গল্পে এর জীবন্ত চিত্র পাওয়া যায়।


নবাব মুর্শিদ কুলি খান ছিলেন দাক্ষিণাত্যের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। তার পিতা হাজী শফি ইস্পাহানি নামে এক নিঃসন্তান ইরানী ব্যবসায়ীর কাছে তার সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। তখন তার নাম রাখা হয় মোহাম্মদ হাদী। উক্ত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাদী ওরফে মুর্শিদ কুলি খানকে পুত্র জ্ঞানে লালন-পালন ও শিক্ষিত করেছিলেন। পরে তিনি পুনরায় বাঙলায় এসে সার্বভৌম নবাব (১৭১৭-১৭২৭) হয়েছিলেন। ভারতীয় সমাজের ইতিহাস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এখানে দাস বা ক্রীতদাস দুই প্রকার ছিল। এক-যারা জমি চাষ করতো, দুই-যারা গ্রামবাসীর প্রজা হিসেবে সেবা করতো। সুলতানি আমলে অবশ্য ধনী ব্যবসায়ী-জমিদার-অভিজাতদের মধ্যে সেবা এবং প্রহরী হিসেবে খোজা এবং ক্রীতদাস নিয়োগ করার রেওয়াজ চালু ছিল। এজন্য বিদেশ থেকে ক্রীতদাস আমদানির পাশাপাশি যুদ্ধবন্দীদের দাস  হিসেবেও শ্রমবাজারে বিক্রি করে দেয়া হতো। বাঙলার বারভূঁইয়ার অন্যতম ঈসা খাঁ এবং তার ভাইকে শৈশবে শত্রুপক্ষের হাতে বন্দি হয়ে দাস হিসেবে বিক্রিত হতে হয়েছিল।


মেগাস্থিনিস এবং ফ্রাসোয়াঁ বার্নিয়ারের লেখায় ভারতে দাস প্রথা চালু থাকার বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যায়। ইবনে বতুতা ১৩৪৫-৪৬ সালে যখন ‘বাঙ্গালাহ’ (বর্তমান পূর্ববঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ) ভ্রমণ করেন, তখন শাসন ক্ষমতায় ছিলেন সুলতান ফকরুদ্দিন মুবারক শাহ। সে সময়ে হাট বাজারে ক্রীতদাস/ দাসী কেনাবেচা হতো। তিনি তার ভ্রমণ কাহিনীতে উল্লেখ করেছেন, ‘উপপত্নীরূপে সেবা কাজের উপযুক্ত একটি সুন্দরী যুবতীকে এক স্বর্ণ দিনারে আমার সম্মুখে বিক্রি করা হয়। আমি ‘আশুরা’ নাম্নী একটি যুবতী ক্রীতদাসীকে প্রায় একই মূল্যে ক্রয় করি। দাসীটি অসাধারণ সুন্দরী ছিল। আমার সঙ্গীদের একজন এক স্বর্ণ দিনারে ‘লুলু’ নামে একটি ছোট সুন্দর বালক ক্রীতদাস ক্রয় করেন’। জানা যায় যে, শাড়া, গুল ও লালা নামের ০৩জন ক্রীতদাসী সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের হেরেমে বিরাট সম্মান লাভ করে। সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রী লুৎফুন্নেসাও পূর্ব জীবনে একজন ক্রিতদাসী ছিলেন।


বণিকরা বিভিন্ন দেশ থেকে ক্রীতদাস এনে বাঙলার বাজারে বিক্রি করতো। এদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক আফ্রিকান ক্রীতদাস বাজারে উঠতো। অধিকাংশ দাস আমদানি করা হতো ইথিওপিয়া, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, পারস্য, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো থেকে। ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র লিখেছেন, ‘ক্রীতদাস প্রথা বহুদিন ধরে ভারত, পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপে প্রচলিত ছিল। হিন্দুশাস্ত্রে বিভিন্ন শ্রেণীর ক্রীতদাসের কথা বলা হয়েছে, যেমন-গৃহস্থের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন এমন ক্রীতদাস, কেনা হয়েছে এমন ক্রীতদাস, অর্জিত ক্রীতদাস এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ক্রীতদাস। আরবরা এবং পরে তুর্কীরাও ক্রীতদাস রাখতো। তবে  ক্রীতদাস পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো যুদ্ধবন্দী। মহাভারতেও যুদ্ধবন্দিদের ক্রীতদাসরূপে গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। তুর্কীরা ভারতের ভিতর ও বাইরের বিভিন্ন যুদ্ধে এইভাবে বহুসংখ্যক ক্রীতদাস সংগ্রহ করেছিল। পশ্চিম এশিয়া ও ভারতে পুরুষ ও স্ত্রী ক্রীতদাসের বাজার ছিল। তুর্কি, ককেশিয়, গ্রীক ও  ভারতীয় ক্রীতদাসের কদর ছিল এবং তাদের চাহিদাও ছিল।’ শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ লিখেছেন, ‘তুর্কিদের আর্যাবর্ত জয়ের কিছুদিন পর থেকে মধ্য এশিয়ায় ক্রীতদাস বাজারে মন্দা দেখা যায়। মহম্মদ ঘোরী থেকে শুরু করে প্রথম দিকের সকল তুর্কি সুলতান এ সময়ে উচ্চমূল্যে ক্রীতদাস ক্রয় করার কারণে সে সময়ে বাজার বেশ তেজী হয়ে উঠেছিল। দৈহিক শক্তি শারীরিক সৌন্দর্যের  মানদণ্ডে তাদের মূল্য নির্ধারিত হতো। ভারতে এসে তাদের অনেকে বিভিন্ন রণক্ষেত্রে কৃতিত্ব দেখানোর যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা পায়, নিজেরাই এক-একজন ক্রেতা হয়ে দাঁড়ায়।


মোঙ্গলরা যুদ্ধক্ষেত্রে অসংখ্য লোক হত্যা করলেও দাস ব্যবসাকে সুনজরে দেখতো না। তাই মোঙ্গল অভ্যুত্থান হওয়ায় এই বাজারে ভীষণ আলোড়ন দেখা দেয়। তাদের অধিকারভুক্ত অঞ্চলগুলিতে এই ব্যবসা নিষিদ্ধ হয়। অথচ ভারতের তুর্কি রাজ্যগুলিতে শুধু নয়, পশ্চিম এশিয়ায় তাদের স্বগোত্রীয় শেলজুক তুর্কিগণ যে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল সেখানেও ক্রীতদাসের চাহিদা তখন যথেষ্ট। তার পরে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে স্পেনীয়রা আমেরিকায় যেসব কলোনি স্থাপন করে সেগুলির উন্নয়নের জন্যও বহু ক্রীতদাসের প্রয়োজন হয়।’ বাঙলার সুলতানদের অশ্বারোহী বাহিনীতে হাবশি ক্রীতদাসদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সুলতান বারবক শাহ এক চালানেই ৮,০০০ হাবশি দাস আমদানি করেছিলেন। তারিখ-ই-ফিরিশতা মতে তিনি মোট ৮০,০০০ আফ্রিকান দাস ক্রয় করেছিলেন। হাবশি দাস প্রসঙ্গে ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে পাওয়া যায়,


হাবসী ইমাম বক্স হাবসী প্রধান। 

হাতী ঘোড়া উট আদি তাহার যোগান।।


পর্তুগীজ বণিক বারবোসা বাংলাদেশের দাস ব্যবসা এবং খোজাকরণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘এই শহরের (বাঙ্গালা) মুরদেশীয় (মরক্কো) বণিকগণ দেশের অভ্যন্তরে চলে যায় এবং পিতামাতা বা অন্যদের নিকট থেকে বহু ছেলে-মেয়ে ক্রয় করে আনে। এরা এ ধরণের ছেলে-মেয়েদেরকে চুরি করে নিয়েও খোজা বানায়। এর ফলে তাদের কিছু সংখ্যকের মৃত্যু হয় এবং যারা আরোগ্য লাভ করে তাদেরকে তারা ভালোভাবে লালন পালন করে। তারপর এদেরকে পণ্যদ্রব্য হিসেবে ব্যবহার করে এবং প্রত্যেককে ২০ বা ৩০টি ইউরোপীয় স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রায় ইরানিদের নিকট বিক্রয় করে দেয়। ইরানিগণ তাদের স্ত্রী ও গৃহের জন্য পাহারাদার হিসেবে এদের খুব প্রয়োজনীয় মনেকরে।’ আবুল ফজল উল্লেখ করেন যে, ‘শ্রীহট্ট ও ঘোড়াঘাট অঞ্চল থেকে বহু খোজা সরবরাহ করা হতো।’ এক সময় এদেশের দরিদ্র পিতামাতা’রা বহু সন্তান থাকলে তাদের মধ্য থেকে দু’একজনকে খোজা বানিয়ে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে দিত। কম বয়স্ক বালক দাসদের শিশু বা কৈশোরকালেই চিকিৎসক দ্বারা নপুংসক করে মহিলা মহলের প্রহরী এবং গৃহকর্মী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। অনেক সময়ে এসব খোজা জন্মগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ থাকতো। মগ-পর্তুগীজ-হার্মাদরাও শিশুদের কিনে বা অপহরণ করে খোজা বানিয়ে বিক্রি করে দিত। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলে পাওয়া যায়,


নপুংসক লোক রাজা আনে ডাক দিয়া।

পুরীর ভিতরে মুলা দিল পাঠাইয়া।।


পরবর্তীকালে সম্রাট জাহাঙ্গীর ফরমান জারি করে বাংলাদেশের তরুণদের খোজা করার রীতি বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেনা হিসেবে নিয়োগকৃত হাবশিদের খোজাকরণ করা হতো না। মুঘলদের আমলে দাস ব্যবসার সূত্র ধরে পর্তুগীজ এবং মগ দস্যুদের অপকর্ম বাঙলার সমাজ জীবনে যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল তা সামাজিক নিরাপত্তাকে দারুণভাবে ব্যাহত করে।


১৫৭৯ সালে মুঘল সম্রাট আকবরের কাছে অনুমতি নিয়ে ফিরিঙ্গি অর্থাৎ পর্তুগীজরা বাঙলার সাতগাঁও এবং নদী তীরবর্তী এলাকায়গুলোয় বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেছিল। পরে হুগলীতে বাণিজ্যিক দূর্গ  স্থাপন করে নিজেদের সুরক্ষিত করে এরা ব্যবসায় শুল্ক ফাঁকিসহ নানা দুর্নীতি আরম্ভ করে। এরা ইছামতী নদীর তীরে ১২ মাইল বিস্তৃত এলাকায় ফিরিঙ্গি বাজারের প্রচলন এবং ধাকা, বাখরাগঞ্জ, নোয়াখালিতে বসতি স্থাপন করে। এসময় ২৫ হাজার পর্তুগীজ এদেশের নারীদের অপহরণ, ধর্ষণ, ধর্মান্তরিত করে রক্ষিতায় পরিণত করে এবং ক্রীতদাসীরূপে আরাকানে পাচার করে দিত। এরা বন্দী মানুষদের হাতের তালু ছিদ্র করে বেত ঢুকিয়ে বেঁধে নিয়ে বিক্রি করে দিত। পর্তুগীজদের অত্যাচারের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিখ্যাত সমালোচক অরবিন্দ পোদ্দার লিখেছেন, ‘ষোড়শ শতকের শেষের দিক থেকেই বাঙলার সমুদ্র ও নদীপথে মগ-ফিরিঙ্গিদের দস্যুতার ও দৌরাত্ম্যের ঢেউ-এ ঢেউ-এ মাতামাতি শুরু হয়, তাঁহারা হিন্দু-মুসলমান স্ত্রী-পুরুষ ছোট-বড় সকলকেই বন্দী করিয়া তাহাদের হাতের পাতা ছিদ্র করিয়া তন্মধ্যে সরু বেত প্রবেশ করাইয়া বাঁধিত এবং একজনকে আরেকজনের উপর চাপাইয়া জাহাজের পাটাতনের নিম্নে ফেলিয়া রাখিত। যেমন লোকে পাখীকে আহার করিতে দেয়, সেইরূপ তাহারা  প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় উপর হইতে বন্দীদের আহারের নিমিত্তে চাউল ছড়াইয়া দিত।……ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে এই দস্যুদলের যাতায়াতের কারণে নদীগুলির উভয় পার্শ্বে একজন গৃহস্থও রহিল না। দস্যুদল লুন্ঠন ও নর-নারী হরণ করিয়া এই প্রদেশের অবস্থা এমন করিয়া ফেলিয়াছে যে, তথায় একটি বসত বাড়ীও নাই, অথবা একটি প্রদীপ জ্বালাইবার লোকও নাই।’ এদের অপকর্ম এবং  অত্যাচার এতদূর পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যে, সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের ২ জন যুবতী বাদীকে তারা অপহরণ করে নিয়ে যায়। সম্রাট শাহজাহান এতে মহাক্রুদ্ধ হয়ে ১৬৩২ সালে বাঙলায় মুঘল শাসনকর্তা কাসিম খান ও তার পুত্র এনায়েত উল্লাহকে দিয়ে হুগলী আক্রমণ করান এবং ৩ মাস অবরোধ করে রাখেন। ঐতিহাসিক আব্দুল হামিদ লাহোরীর মতে, এতে ১০ হাজার পর্তুগীজ প্রাণ হারায়, ৪৪০০ জন বন্দী হয় এবং এদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে জেলে পাঠানো হয়।


সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে ফিরিঙ্গি এবং মগ অর্থাৎ আরাকানীরা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ‘ইস্ট ইন্ডিয়া ক্রনিকল’ থেকে জানা যায় যে, ‘১৭১৭ সালে মগেরা বঙ্গদেশের ১৮০০ অধিবাসীকে বন্দি করে মগ রাজার সম্মুখে উপস্থিত করে। আরাকানরাজ তাদের মধ্য থেকে একদলকে বেছে নিয়ে নিজের দাসত্বে নিয়োগ করেন। অবশিষ্টদিগকে পশুর ন্যায় গলায় রশি বেঁধে বাজারে বিক্রি করা হয়।’ তারা আবারো বাঙলার নদী তীরবর্তী গ্রামাঞ্চল, হাটবাজার আক্রমণ করে খুন, ধর্ষণ, লুটপাট চালাতো এবং ক্রীতদাস বানানোর জন্য লোকজনদের অপহরণ করতো। মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলে এরকম চিত্র ফুটে উঠেছে। কবি লিখেছেন,


ফিরাঙ্গীর দেশ খান বাহে কর্ণধারে 

রাত্রিতে বাহিয়া যায় হারমদের ডরে।


এতে করে বাঙলার অনেক জনবহুল গ্রাম লোকালয়শূন্য হয়ে পরে। শায়েস্তা খান বাঙলার সুবেদারির দায়িত্ব নিয়েই ১৬৬৪-৬৫ সালে মুঘল নৌবাহিনীর মাধ্যমে মগ ও ফিরিঙ্গিদের পরাজিত করে সন্দ্বীপ কেড়ে নেন। এতে বাঙলায় শান্তি শৃঙ্খলা ফিরে আসে। ফরাসি পর্যটক ফ্রাসোয়াঁ বার্নিয়ারের ভাষায়,‘হাট-বাজারের দিন গ্রামের মধ্যে ঢুকে গ্রামের লোকদের তারা ক্রীতদাস করার জন্য বন্দী করে নিয়ে যেত। উৎসব-পার্বণের দিনও তারা এইভাবে গ্রামাঞ্চলে হানা দিত। অনেক সময় গ্রামের পর গ্রাম আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিত। নিম্নবঙ্গে (দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের) কত গ্রাম যে তারা লুণ্ঠন করেছে এবং অত্যাচার করে জনশূন্য করে দিয়েছে তার হিসাব নাই। এদের অত্যাচারে নিম্নবঙ্গের জনবহুল গ্রাম লোকালয় শূন্য অরণ্যে পরিণত হয়েছে।


দাস ব্যবসার সঙ্গে আফ্রিকার বিভিন্ন রাজা ও গোত্রপ্রধানরা সরাসরি জড়িত ছিলেন। আধিপত্য বিস্তার বা অন্য কোন অজুহাতে এক রাজা অন্য রাজার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে অন্য এলাকা দখল করে বিজিতদের বন্দী করতেন। পরবর্তী সময়ে এসব যুদ্ধে প্রাপ্ত যুদ্ধবন্দীকে টাকা বা পণ্যের বিনিময়ে দাসরূপে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি দেয়া শুরু হয়। এছাড়া ব্যবসায়ীদের নিয়োগকৃত দালাল মানুষকে অপহরণ করে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করতো। দাস বাজারে এই আফ্রিকান দাসদের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশী। মধ্যযুগে বাঙলা সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে আফ্রিকান দাসদের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশী। রাজা ও সুলতানগণ বাছাইকৃত উপযুক্ত দাসদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করতেন। বাঙলার পক্ষে বহু যুদ্ধজয়ে তাদের অবদান রয়েছে।


মুসলমান সুলতানদের অনেক দাস সেনাধ্যক্ষ ভারত সাম্রাজ্যে শাসক নিযুক্ত হয়। অনেকে এমনকি দিল্লীর সিংহাসনেও বসেছিলেন। এদের মধ্যে সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেক, ইলতুতমিশ, গিয়ালউদ্দিন বলবন অন্যতম। দাসগণ নিজের যোগ্যতার বলেই শাসক, অভিজাত শ্রেণিতে উন্নীত হবার সুযোগ পেত। এছাড়া মনিবের মর্জি মাফিক বিয়ে, ঘর-সংসার করতে পারতো। তবে অধিকাংশ দাস-দাসীর জীবনের তেমন স্বাধীনতা ছিলনা। তাদের বিয়ে, সন্তান জন্মদানের অনুমতি নিতে হতো। তাদেরকে পশু-পাখি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মত হাতফেরি করে বেচাকেনা করা হতো। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্যে উল্লেখ আছে যে, হাসন কাজি মনসাভক্তের ওপর নির্যাতন চালালে মনসা তার বাহিনী নিয়ে হাসনাহাটি, কাজীহাটী, জোলাহাটী ও হালিয়ারনগরে আক্রমণ চালায়। হাসনাহাটীতে কাজির বাড়িতে আক্রমণ সূত্রে জানা যায়-কাজির ৩ স্ত্রীর বহু দাস-দাসী ছিল এবং তারা আয়েসী জীবন যাপন করতো। বাড়ির অনেক দাসদের মধ্যে দুলাল ছিল কাজির প্রিয়পাত্র। কবি লিখেছেন,


নামে দুলাল বান্দি      তার লাগি কান্দে কাজি

         চাখন চাহিয়া চাহিবেক।

দন্ত সিমইলের ফুল     বচন য়ানের গুণ

        হেন বান্দি খাইল সাপে।।


আবার উজানিনগরের বণিক সাহে সওদাগরের বাড়িতেও বহু দাস-দাসী দেখা যায়। শুধু বেহুলার সখী পর্যায়ের দাসী ছিল একশত, যাদের নিয়ে বেহুলা মুক্তাসার পুকুরে স্নান করতে যায়। কবি লিখেছেন,


কার্য্যের গৌরবে যদি তোমার আজ্ঞা পাই।

একশত সখী সঙ্গে মুক্তাসারে যাই।।

............

তবে বেউলা পরিলেক নানা অলঙ্কার।

সখীগণ লইয়া চলে দিঘি মুক্তাসার।।


ইসলামী আদর্শ, সুফী-দরবেশদের মানবতাবাদের কারণেই ভারতীয় উপমহাদেশে ধীরে ধীরে এ প্রথা কোমল রূপ ধারণ করে এবং একসময় বিলুপ্তি ঘটে।



হদিস:   

১। বাংলায় আফ্রিকান অভিবাসী- আখতার উদ্দিন মানিক 

২। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি- গোলাম মুরশিদ 

৩। মঙ্গলকাব্যে বাঙালির আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের রূপায়ণ- মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর  

৪। বাঙ্গালার ইতিহাস- রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় 

৫। ইন্টারনেট  



পোস্ট ভিউঃ 31

আপনার মন্তব্য লিখুন