বাংলায় পর্তুগীজ জাতি

লেখালোক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য
বাংলায় পর্তুগীজ জাতি

পর্তুগীজ জাতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আনারসের কথা এসে যায়, কারণ আজ থেকে চারশ বছর আগে বাংলায় ওই ফলটা তারাই এনেছিল। আমরা আনারস বললেও পর্তুগিজ ভাষায় ‘আনানাস’ বলে। আনারস ছাড়াও আলু, টমাটো, মরিচ, ঢেঁরস, কাজু বাদাম, কামরাঙা এমনকী পেয়ারাও পর্তুগীজরাই বাংলায় এনে চাষাবাদ করেছিল। এর বাইরেও চাবি, বালতি, পেরেকে, তামাক, গির্জা, বিশপ, বোতল, স্পঞ্জ, আতা (ফল), বারান্দা, মাস্তুল, ইস্ত্রী, আলপিন, তুফান, বজরা, কামান, পিস্তল, লোকলস্কর, আয়া এসবই পর্তুগীজ ভাষাজাত শব্দ। পূর্ণেন্দু পত্রী লিখেছেন,‘ যে ‘সাবান’ রোজ গায়ে মাখি, যে   ‘জানালায়’ আকাশকে কাজে পাই, যে ‘আলমারি’তে থাকে থাকে সাজাই অনেক দামে কেনা আদরের বইগুলো,‘বেহালা’র কান্নায় নিজের কান্না শুনে কাঁদি যখন,‘বোতাম’ লাগাই জামায়, পা ছড়িয়ে জিরিয়ে নিই ‘কেদারায়’ বসে, তখন ক্ষণে ক্ষণে আমরা পর্তুগিজদের সম্পদকেই নিজেদের ব্যবহারে খাটাচ্ছি। বাঙালি তামাক খাওয়া শিখেছে ওদেরই কাছ থেকে। তাই নিয়ে পুঁথি পর্যন্ত রচনা হয়েছে। নাম ‘তামাকু মাহাত্ম’।’


দিবা নিশি যেই নরে, তামাকু ভক্ষণ করে,

অন্তকালে চলে যায় কাশী।


মুঘল আমলে ফরাসি পরিব্রাজক ফ্রাসোয়া বার্ণিয়ের ভারতবর্ষে এসেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘বাঙালির সঙ্গে মিশে পর্তুগিজরা নানারকম সুস্বাদু মিষ্টান্ন ও তৈরি করেছে সেকালে।’  বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতিতে যে পর্তুগীজদের এত অবদান তারাই আবার বাংলাজুড়ে ফিরিঙ্গী জলদস্যু হিসেবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। বাংলাভাষায় প্রথম বইটিও ছেপেছিল তারা।


ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগীজরাই প্রথম বাংলায় আসে। বার্থোলোমিউ দিয়াজ কালিকূট বন্দরে অবতরণ করেন। তিনি ছিলেন একজন রোমান ক্যাথলিক পর্তুগীজ নৌ-অভিযাত্রী। তার জন্ম ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে। তাকে ভারতে যাওয়ার বিকল্প পথ বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কারণ পনেরো শতকের শেষ দিক থেকে এশিয়া থেকে মসলা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভেনিস ও আরব বণিকদের এড়িয়ে বিকল্প পথ অনুসরণ  করে ভারতে তথা বাংলায় অনুপ্রবেশ করা তাদের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। অবশ্য ইউরোপ থেকে ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার করেন ভাস্কো দা গামা। এই পর্তুগীজ নৌ কমান্ডার ১৫২৪ সালে সালে স্বল্প সময়ের জন্য 'পর্তুগীজ ইন্ডিয়া'র গভর্নর ও ছিলেন। ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামার নেতৃত্বে ইউরোপীয়রা জলপথে ভারতে প্রবেশ করেছিল।


পর্তুগীজদের বাংলায় আসার আগেই ইউরোপ অবধি বাংলার ধনসম্পদের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। উর্বরা মাটিই বাংলার কৃষিপণ্যকে একটি উন্নত স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল। বিশেষ করে চাল এবং তুলা। এছাড়া মসলা ও বস্ত্রশিল্পেও বাংলার প্রশংসনীয় অগ্রগতি হয়েছিল। রোমান মেয়েরা নাকি ঢাকাই মসলিন কাপড়ের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতো। এসব কারণেই পর্তুগীজ বণিকের লোভাতুর দৃষ্টি পড়েছিল বাংলার ওপর। পণ্যের বিপননের জন্য ষোড়শ শতাব্দীর বাংলায় দুটো সমৃদ্ধশালী বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল, পুবে চট্টগ্রাম আর পশ্চিমে সপ্তগ্রাম। সপ্তগ্রাম ছিল একটি সরগরম গঞ্জ, চট্টগ্রামও সমৃদ্ধশালী ছিল।


২ 

১৫৮০ খ্রিস্টাব্দ। মুগল বাদশা আকবর পর্তুগীজদের হুগলি নদীর পাড়ে বসতি স্থাপনের সনদ প্রদান   করেন। জায়গাটি বর্তমান কলকাতার ২৫ মাইল উজানে। পর্তুগীজরা তাদের বসতিকে বলত Porto  Pequeno, জায়গাটি এখন ব্যান্ডেল নামে পরিচিত। জায়গাটি ষোড়শ শতকের একটি প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠে। বাংলার পণ্য ছিল সস্তা, পর্তুগীজ বণিকেরা সে পণ্য কিনে এশিয়ার পুবের বন্দরে চড়া মূল্যে বিক্রি করতো। প্রথম প্রথম কেবল বর্ষাকালেই তারা বাংলায় ব্যবসা করতো। বর্ষা শেষ হলে তারা গোয়ায় চলে যেত। পশ্চিম ভারতের গোয়া ছিল পর্তুগীজদের অন্যতম ঘাঁটি, পরে তারা বাংলায় স্থায়ী ভাবে বসতি গড়ে তোলে এবং ধীরে ধীরে বণিক থেকে পরিণত হয় জলদস্যুতে।


১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় পর্তুগীজদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০,০০০ হাজার। অবশ্য বিশুদ্ধ পর্তুগীজ ছিল মাত্র ৩০০। বাংলাপিডিয়ায় অনিরুদ্ধ রায় লিখেছেন, ‘তাদের আগমনের প্রথম দিক থেকেই পর্তুগিজরা স্থানীয় মহিলাদের সাথে বিয়েতে আপত্তি করেনি।’ কুড়ি হাজার পর্তুগীজের অর্ধেক বাস করতো হুগলি। বাকিরা সপ্তগ্রাম, চট্টগ্রাম, ঢাকা ইত্যাদি জায়গায়। তারা বিলাসবহুল জীবন কাটাতো এবং স্থানীয় নবাবদের মতন পোশাক পড়তো। পর্তুগীজ পাদ্রীদের সঙ্গে বাদশাহ আকবরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।


আকবরের রাজত্বকাল থেকে শায়েস্তা খাঁর আমল অবধি অর্থাৎ ১৬৬৬ অবধি বাংলার গ্রাম ও জনপদে অবাধ লুন্ঠন চালিয়েছিল পর্তুগীজরা। বাংলার মানুষের কাছে তারা ‘হার্মাদ’ নামে পরিচিত ছিল। হার্মাদ অর্থ ‘জলদস্যু’। কথাটা এসেছে স্পেনিশ নৌবহর ‘আরমাডা’ থেকে। অসংখ্য জাহাজ এক সারিতে সাজিয়ে শুরু হতো তাদের লুন্ঠন অভিযান। জাহাজগুলিকে বলা হতো ‘বহর’। বহরের ক্যাপ্টেন হলেন ‘বহরদার’। আক্রমনের প্রধান স্থান ছিল চট্টগ্রাম, খুলনা, চব্বিশ পরগণার উপকূল, নোয়াখালি, সন্দ্বীপ, বরিশাল। এসব জায়গায় পর্তুগীজদের ঘরবাড়িও ছিল। হার্মাদরা কখনও ছোটছোট ডিঙিতে তীরের বেগে ছুটে এসে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলতো বণিকের জলযান। কখনওবা মাইলের পর মাইল হেঁটে এসে উৎসব মুখর বাড়িতে হানা দিয়ে লোকের ওপর অত্যাচার চালাতো। মেয়েদের ওপর অত্যাচার ছিল অকল্পনীয়। মেয়েদের চরম অপমানের পর ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রি করে দিত আরাকানে। আজও বাংলাদেশের পল্লী গানে সেইসব হত্যভাগ্য নারীদের বিলাপ ধ্বনিত হয়:


অভাগিনীরে মনে রাখিও। ঘাটে আমার কলসী পড়িয়া রহিল, আমার হাতের কঙ্কন ফেলিয়া আসিয়াছি; আমাকে মনে করিয়া দুঃখ হইলে কঙ্কন ও কলসী তোমার হাত দুখানি দিয়া ছুঁইও-তাহাতে আমি জুড়াইব। আর সুন্দরী দেখিয়া একটি মেয়ে বিবাহ করিও। আমি যে আদর ও স্নেহের জন্য পাগল ছিলাম, তাহা তাহাকে দিও, হতভাগিনীর অদৃষ্টে তাহা নাই।


সমুদ্র উপকূলীয় গ্রামগুলিতে হানা দিয়ে নারী অপহরণ এবং ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রি করা ছিল তাদের  একচেটিয়া ব্যবসা। এই ব্যবসার কেন্দ্র ছিল বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালি। তারা ছোট ছোট শিশুদেরও অপহরণ করে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিত।


আকবরের মৃত্যুর পর মুঘল সিংহাসন লাভ করেন বাদশা জাহাঙ্গীর। তার সেনাপতি মানসিংহ বাংলায় বারো ভূঁইয়াদের বিদ্রোহ দমন করতে আসেন। পর্তুগীজরা তখন মুঘল সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছিল। ফ্রান্সিস কার্ভালো, রডা গঞ্জালেস প্রমূখ পর্তুগীজ যোদ্ধারা প্রতাপাদিত্যর পক্ষের নৌ সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। তারা পদ্মা, মেঘনা আর কর্ণফুলিতে বাণিজ্যতরী আটকে কর আদায় করতো, মক্কাগামী হযযাত্রীদের জাহাজ থামিয়ে লুটপাট করতো, হিন্দুদের দেবীমূর্তি ভাঙ্গতো। এসব কথা সম্রাট জাহাঙ্গীরের কানে গেলে তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে পর্তুগীজ দমনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। ঢাকার নতুন নাম দেয়া হয় ‘জাহাঙ্গীর নগর’। সম্রাট শাহজাহান (১৫৯২-১৬৬৬) এর সময়েই বাংলায় পর্তুগীজ শক্তি নির্মূল হয়। বাবা সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে বিদ্রোহ করে শাহজাহান একবার বাংলায় এসেছিলেন। সেসময় তিনি পর্তুগীজদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছিলেন তাই কাশেম খাঁকে বাংলার শাসনকর্তা নিয়োগ করে বললেন, ‘আমার প্রজার সুখেই আমার সুখ। আপনি পর্তুগীজদের ধ্বংস করেন’। এর পরপরই মুঘল সৈন্যদের সঙ্গে পর্তুগীজদের যুদ্ধ বাঁধলো, ভয়ঙ্কর সে যুদ্ধ তিন মাস চলে। ব্যান্ডেলে মুঘল সৈন্যরা মাটির তলায় সুড়ঙ্গ কেটে সেই সুড়ঙ্গে বারুদ পুরে পর্তুগীজ দুর্গ উড়িয়ে দিলে হাজার হাজার পর্তুগীজ নরনারী নিহত হন। ১৬৬৬ সালে মুঘল সেনাপতি বুজুর্গ উমেদখান পর্তুগীজদের পরাজিত করে চট্টগ্রামে মুঘল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। সম্রাট শাহজাহান এভাবেই তার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন।


পর্তুগীজ মাত্রই হার্মাদ বা খারাপ ছিলনা, অনেক সৎ মানুষ ছিলেন তাদের মধ্যে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সেন্ট জেভিয়ার। অতি সজ্জন সাধু ছিলেন তিনি। রাজনীতি নয়, ধর্মই ছিল তার আদর্শ। বাংলায় পর্তুগীজদের অত্যাচার ও অসংযত জীবনযাত্রায় ক্রুদ্ধ হয়ে উনি শ্রীলঙ্কায় চলে যান। পর্তুগীজরা যতই গ্রামবাংলা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিক না কেন বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে তাদের অসামান্য ভূমিকা রয়েছে, যেমন- বাংলায় ছাপাখানা বা বই ছাপানোর পিছনে পর্তুগীজদের অবদান অসামান্য। বাংলা ভাষার প্রথম বইটি ১৭৪৩ সালে পর্তুগীজদের হাতেই ছাপা হয়। রোমান হরফে তখন তিনটি বই ছাপা হয়েছিল, ব্রাহ্মণ-রোমান ক্যাথলিক সংবাদ, কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ এবং বাংলা ও পর্তুগীজ ভাষার শব্দকোষ ও ব্যাকরণ। ১৫৯৯ সালে ফাদার সোসা একটি ক্ষুদ্রাকৃতি ধর্মীয় পুস্তিকা বাংলায় অনুবাদ করেন। অবশ্য এর কোনও প্রতিলিপি এখন আর নেই।



হদিসঃ 

১। পুরনো কলকাতার কথাচিত্র- পূর্ণেন্দু পত্রী
২। বাংলাপিডিয়া 

৩। ইন্টারনেট




পোস্ট ভিউঃ 7

আপনার মন্তব্য লিখুন