১
The Burial of Jesus
“42 It was Preparation Day (that is, the day before the Sabbath). So as evening approached, 43 Joseph of Arimathea, a prominent member of the Council, who was himself waiting for the kingdom of God, went boldly to Pilate and asked for Jesus’ body. 44 Pilate was surprised to hear that he was already dead. Summoning the centurion, he asked him if Jesus had already died. 45 When he learned from the centurion that it was so, he gave the body to Joseph. 46 So Joseph bought some linen cloth, took down the body, wrapped it in the linen, and placed it in a tomb cut out of rock. Then he rolled a stone against the entrance of the tomb.”
(Mark 15:42-46)
যোশেফ যে লিনেন কাপড় দিয়ে যীশুর (Jesus Christ) মৃতদেহটা মুড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই কাপড়টাই ইতিহাসে ‘শ্রাউড অফ তুরিন’ নামে খ্যাতি লাভ করেছে। কাফনের এই কাপড়টা ৪.৩৬ মিটার লম্বা ও ১.১০ মিটার চওড়া এবং সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ঘটনা হলো সেখানে একজন ক্রুশ বিদ্ধ হওয়া লোকের দেহের ছাপ পাওয়া গেছে। কাপড়ের অর্ধেক অংশে পেছনের ছাপ, বাকী অংশ মাথার চারপাশে জড়ানো থাকায় তাতে সামনের ছাপ ফুটে উঠেছে। তুরিনের কাফনের কাপড়ে একজন মানুষের মাথা, মুখমন্ডল, বক্ষপিঞ্জর,বাহু, হাত, পা, পায়ের পাতার ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কালের বিবর্তনে ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার কারনে সৃষ্ট রক্তের দাগ সেপিয়া বর্ণ ধারণ করেছে। কাফনের কাপড়ের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, দুটো গাঢ় দাগ কাপড়ের দৈর্ঘ্য বরাবর বিস্তৃত, যা দুটো বড় হীরকাকৃতির দাগের সাথে এসে মিশেছে। এগুলো পোড়া দাগ যা হাল্কা রংয়ের সুতা দিয়ে রিপু করা হয়েছে। ১৫৩২ সালে ফ্রান্সের ক্যামবেরীতে অবস্থিত চ্যাপেলে একটা অগ্নিকান্ডের কারণে এই দাগটার সৃষ্টি হয়েছে। এক অগ্নিকান্ডের কারণে রূপার সিন্দুকে ৪৮ ভাগে রক্ষিত এই কাপড় প্রায় পুড়ে যাবার উপক্রম হয়েছিলো এবং আগুনের উত্তাপে রূপার সিন্দুক পুড়লে গলিত রূপার ক্ষুদ্র কণা ভাঁজ করা কাপড়ে এই জ্যামিতিক আকারের পোড়া দাগ তৈরী করে।
১৮৯৮ সালে ইতালির পঞ্চাশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হিসাবে কাফনের কাপড়াটা সবার সামনে উন্মোচিত করা হলে চিত্রগ্রাহক সেকোন্ডো পিয়ো ইতিহাসে সর্বপ্রথম এর ছবি তোলার সুযোগ পান। এতে নেগেটিভের ওপর যীশুর প্রতিকৃতি ফুটে উঠে। এরপর গুইসেপ্প এনরিয়ের ১৯৬১ সালে তোলা সাম্প্রতিক ছবি নিশ্চিত করে যে ছবিটি অঙ্কিত হয়নি কারণ এর কোন আউট লাইন নেই, দেহের ছাপ ক্রমশঃ কাপড়ে মিশে গেছে।
১। রোমান আইনে শাস্তি প্রদর্শনের সময় অপরাধীর শরীর যেভাবে ছিলো সেভাবেই আলখাল্লার ছবিটি আছে।
২। ক্রুশবিদ্ধ শরীরটা যে যীশুর এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না কারণ সে সময় অহরহ ক্রুশবিদ্ধ করে শাস্তি দেয়া হতো। এমনকি যীশুর সাথে অন্য দুজনকে একই সাথে ক্রুশে ঝোলানো হয়েছিলো। যেহেতু প্রথম রোমান সম্রাট কনসষ্ট্যানটাইন ক্রুশবিদ্ধ করার অমানবিক প্রথা বিলোপ করেন, তাই নিশ্চয়ই এই কাপড় ৩৩০ খ্রীষ্টাব্দের আগের।
৩। প্রতিকৃতিতে দৃশ্যমান ব্যক্তির দাড়ি এবং চুলের বিন্যাস (মাঝ দিয়ে সিথি) রোমান সম্রাজ্যে প্রচলন ছিলো না, প্রচলতি ছিলো ফিলিস্থিনে। তাই শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তি নাজারেথ সম্প্রদায়ের, এটা বলা যায়।
৪। কাফনে শায়িত লোকটির দেহে গসপেলে বর্ণিত ছয়টা নির্দিষ্ট চিহ্নের আলামত বিদ্যমান।
৫। পিঠে ক্ষুদ্র ডাম্বেল আকৃতির চিহ্ন এবং নব্বইটা চাবুকের দাগ সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
৬। ক্রুশবিদ্ধ ব্যক্তির কাঁধের অবস্থা পর্যালোচনা করলে এটা পরিস্কার বোঝা যায় যে, কিছু সময়ের জন্য হলেও ক্রুশবিদ্ধ ব্যক্তিটি ক্রুশ বহন করছিলো যা গসপেলের বর্ণনার সাথে মিলে যায়।
৭। কপালে এবং মাথার পেছনের অনিয়মিত রক্তের ফোঁটা কন্টক মুকুটের কথা স্মরন করিয়ে দেয়।
৮। চিত্রে যেভাবে দেখা যায়, হাতের তালুতে কীলক বিদ্ধ করে যীশুকে ক্রুশ বিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু কাফনের কাপড়ে ৫৫ থেকে ৬৫ ডিগ্রী কোনে দুহাত প্রসারিত ছিলো, যা রক্তধারা দেখে হিসাব করা যায়। কীলক আসলে হাতের তালুতে না, কব্জিতে বিদ্ধ করা হয়েছিলো। ফরাসী বিষেষজ্ঞ চিকিৎসক বার্বেট প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, চল্লিশ কেজির বেশী ওজনের কারো হাতের তালুতে কীলক মারলে হাত ছিড়ে নিচে পড়ে যাবে।
৯। যোহানের গসপেল অনুযায়ী বক্ষপিঞ্জরের পঞ্চম এবং ষষ্ঠ অস্থির মাঝে বর্শা দিয়ে আঘাত করা হয়েছিলো, যা দেহের ডান পাশে ৪.৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ রক্তের দাগ প্রমান করে।
১০। উরুতে আর পায়ের ডিমে কোন আঘাতের চিহ্ন নাই যা প্রমান করে গসপেলে বর্নিত পা ভেঙে দেয়া হয়নি, অথচ ক্রুশবিদ্ধ আসামীর পা ভেঙে দেয়াই ছিলো তখনকার প্রথা।
২
দু’হাজার বছর কি কোন কাপড় টিকে থাকতে পারে?
প্রাথমিকভাবে অনেকে সংশয় প্রকাশ করেন যে দু’হাজার বছর কি কোন কাপড় টিকে থাকতে পারে? বাস্তবতা হলো কায়রোয় অবস্থিত মিশরের জাতীয় জাদুঘরে, তুরিনের মিশরীয় জাদুঘরে, লন্ডনের ঐতিহাসিক মিশর বিষয়ক শাখায়, প্যারিস, বার্লিন সব জায়গায় ৩৫০০ থেকে ৫০০০ বছরের পুরনো নমুনা দেখতে পাওয়া যায়। কাপড় বা স্ক্রোলের জন্য প্রাচ্যের শুস্ক আবহাওয়া বিশেষভাবে উপযোগী। উভয় ক্ষেত্রেই উদ্ভিজ্জ অনু সেলুলোজ যা খুবই দীর্ঘ স্থায়ী। গ্রীক শব্দ “সিনডন” যাকে ইংরেজীতে কখনো কখনো মসলিন বলা হয়, সংক্ষিপ্ত গসপেলে এই কাপড়ের দৈর্ঘ্য হিসাবে উল্লেখিত আছে। লিনেনের তৈরী কাফনের কাপড়টির সুতাগুলো ৩:১ অনুপাতে বোনার কারনে পানিতে ঢেউ তোলা মাছের আকৃতি নিয়েছে। যীশুর সমসাময়িক এই ধরণের কাপড় খুব কম দেখা যেত, এটা খুবই দামী ছিলো। সেসময়ে রোমের অন্তর্ভুক্ত সিরিয়ায় প্রথম শতকে বোনা এ ধরনের কাপড়ের এক মাত্র নিদর্শন দেখা যায়।
১৯৭৩ সালে ইলেক্ট্রন অনুবীক্ষন যন্ত্র ব্যবহার করে বেলজিয়ামের ঘেনট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেইস তন্তুর মাঝে কিছু তুলার আঁশ দেখতে পান, কিন্তু সমস্যা হল যীশুর আমলে নিকট প্রাচ্যে তুলার চাষ হতো না। কিন্তু পারস্য, সিরিয়া, ভারত থেকে কাপড় বোনার জন্য সে সময় তুলা আমদানীর প্রমান পাওয়া যায়।
সুইজারল্যান্ডের উদ্ভিদ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানী ফ্রাই, পলেন বিশ্লেষনের জটিল পদ্ধতি ব্যাবহার করে কিছু আলোড়ন সৃষ্টিকারী সিদ্ধান্তে উপনীত হন। ১৯৭৬ সালে মার্চে প্রকাশিত তার গবেষনামুলক প্রবন্ধ্যে ফ্রেই লেখেন যে তিনি প্রাপ্ত পলেন থেকে মোট ৪৯ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভিদ পেয়েছেন। কাফনের কাপড়টি সংরক্ষনের ইতিহাসের গতিপথ ট্র্যাক করলে সেই এলাকায় এই ৪৯ প্রজাতির গাছের অনেক নমুনা এখনো দেখতে পাওয়া যায়। যার একটা হলো লেবাননের সিডর। কিন্তু আলোড়ন সৃষ্টিকারী খবর হলো ওই আলখাল্লায় ১১ প্রকার ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভিদের পলেন পাওয়া গেছে যা ইউরোপে জন্মায় না কেবল মাত্র নিকটপ্রাচ্যে দেখা যায়। এগারোটার মাঝে কিছু আবার শুধু মরুভুমিতেই পাওয়া যায়, যেমন- তামারিস্ক, সিবলাইট, আর্টেমেসিয়া। পলেন বিশ্লেষনে এটা সুস্পষ্ট যে, এই কাপড় কোন এক সময় ফিলিস্তিনে ছিলো বা বোনা হয়েছিলো।
ডাঃ ফ্রাই তখনো জানতেন না তিনি কতখানি গুরুত্বপূর্ন আবিস্কার করছেন।
৩
যিশুর সঙ্গে সম্পর্কহীন ‘শ্রাউড অফ তুরিন’?
‘শ্রাউড অফ তুরিন’ বা তুরিনের কাফন বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় ধর্মীয় নিদর্শনগুলির তালিকায় প্রথম সারিতেই থাকে। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার পর, এই কাপড়ে মুড়েই সমাধিস্থ করা হয়েছিলো। সম্প্রতি এই ধর্মীয় বিশ্বাসকেই খণ্ডন করলেন নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড অ্যাকিনসন। তার দাবি, শ্রাউড অফ তুরিনের উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাহলে এই কাপড়খণ্ডের আসল রহস্য কী? আর শ্রাউড অফ তুরিনে থাকা মুখাবয়বের ছাপটিই বা কার?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ফিরে যেতে হবে মধ্যযুগীয় ব্রিটেনে। এই ঐতিহাসিক সামগ্রীটি রক্ষার দায়িত্ব ছিলো ইউরোপের সিক্রেট সোসাইটি ‘দ্য নাইট টেম্পলার’ দের উপরে। একটা সময় নির্যাতনের শিকার হয়ে নাইট টেম্পলারদের ফ্রান্স থেকে এসে বসতি স্থাপন করতে হয় ব্রিটেনের বার্টন-অন-ট্রেন্ট শহরে। তৎকালীন সময়ে নাইট টেম্পলারের নেতৃত্বে ছিলেন রাজা ফিশার। শ্রাউড অফ তুরিন বা তুরিনের কাফন মূলত তার মূর্তিকে মুড়িয়ে রাখতেই ব্যবহৃত হয়েছিলো। এমনটাই দাবি জানাচ্ছেন অ্যাকিনসন।
কিন্তু তার এই দাবির পিছনে যুক্তি কী? মূলত, শ্রাউড অফ তুরিনের বিশ্লেষণে অ্যালাবাস্টার নামের বিশেষ ধরনের জিপসামের উপস্থিতির জন্যই এই দাবি অ্যাকিনসনের। মূলত এই বিশেষ পাথর ব্যবহার করেই মূর্তি নির্মাণ করতেন বার্টন শহরের মধ্যযুগীয় ভাস্কররা। কারণ, বার্টনে অ্যালাবাস্টারের খনি থাকায় তা সহজলভ্য ছিলো। তৎকালীন সময়ে পৃথিবীর অন্য কোথাও এই বিশেষ পাথরটির ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় না বললেই চলে।
অ্যাকিনসনের অভিমত, অ্যালাবাস্টার পাথর দিয়েই চতুর্দশ শতকে তৈরি হয়েছিলো কিং ফিশার-এর একটি প্রমাণ সাইজের মূর্তি। যা স্থাপিত হয়েছিলো বার্টনের অ্যাবেতে। পরবর্তীকালে, চতুর্দশ শতকে এই ভবনটির পুননির্মাণের সময় কিং ফিশারের মূর্তিটি মুড়িয়ে রাখা হয় একটি অতিসাধারণ কাপড়ের টুকরোতে। স্বাভাবিকভাবেই তাতে ছাপ থেকে যায় সেই ভঙ্গুর অ্যালাবাস্টার পাথরের মূর্তির। এখান থেকেই জন্ম ‘শ্রাউড অফ তুরিন’এর। কিং ফিশারের মূর্তির সাথে বাইবেলে বর্ণিত যীশু খ্রিস্টের মুখাবয়বের মিল থাকায়, তৎকালীন যাজকরা সেটিকে বিজ্ঞাপন হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন প্রচারের জন্য। এই বিশেষ কাপড়ের খণ্ড দেখতেই ভিড় জমাতেন বহু খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী মানুষ, তাতে আখেরে লাভ হতো গির্জার। পরবর্তীতে ফ্লোরেন্সের কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি এই লিনেন কাপড়ের টুকরোটি কিনে নেন। এরপর হাত ঘুরে তা এসে পৌঁছায় তুরিনে।
শুধুমাত্র শ্রাউড অফ তুরিনের রাসায়নিক বিশ্লেষণই নয়, আরও একটি পৃথক গবেষণাতেও ফুটে উঠেছে একই সময়কাল। অর্থাৎ, কোনোভাবেই এই কাপড়টির বয়স দু’হাজার বছর হতে পারে না। আর শ্রাউডের গায়ে লেগে থাকে রক্ত এবং অন্যান্য প্রাণীজ কোষের অস্তিত্ব? সেগুলি তবে কীসের?
অ্যাকিনসনের তত্ত্ব অনুযায়ী, শ্রাউড অফ তুরিনের মূল কাপড়টি ছিলো একটি টেবিল ক্লথ। তার ১৩ ফুট বাই ১৩ ফুট আয়তনও সেই ঘটনারই ইঙ্গিত দেয়, আর তাতে প্রাণীকোষ এবং অন্যান্য খাদ্যের অবশিষ্টাংশের উপস্থিতি মূলত একারণেই। যদিও এটি এখনও পর্যন্ত অ্যাকিনসনের তত্ত্ব। কিং ফিশারের মূর্তিটি পাওয়া গেলেই এই তত্ত্বের অকাট্য প্রমাণ মিলবে বলেই বিশ্বাস তার। তার অভিমত ‘শ্রাউড অফ তুরিন’ এর জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য তৎকালীন খ্রিস্ট সন্ন্যাসীরা ফিশারের মূর্তিটি সরিয়ে ফেলেছিলেন বা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।
৪
‘ম্যান্ডেলিয়ন’ বা কাপড়ের ছোট টুকরো
‘শ্রাউড অফ তুরিন’ এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে জেনে নেই ‘ম্যান্ডেলিয়ন’ কি?
‘শ্রাউড অফ তুরিন’ নিয়ে ডিটেইলস কাজ করছেন বৃটিশ ঐতিহাসিক ইয়ান উইলসন। তার হাতে যে বিপুল দলিল দস্তাবেজ ছিলো তা দিয়ে তিনি প্রমান করেন “এডেসা প্রতিকৃতি” র সাথে তুরিনের কাফনের কাপড়ের সম্পর্ক প্রথম শতাব্দী থেকেই, যা ষষ্ঠ শতকে এসে “ম্যান্ডিলিয়ন” নামে পরিচিত ছিলো।
‘গসপেল অফ বার্নাবাস’ মতে যীশুর মৃত্যু হয়নি, তাকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিতর্কিত “গসপেল অফ হিব্রু” অনুসারে Resurrection বা পুনরুত্থানের পরে যীশু কাফনটা পুরোহিতদের ভৃত্যদের দেয়া হয়েছিলো। বিশেষ কোন সেবা প্রদানের কারণে পুরোহিতদের ভৃত্যদের বা যাকেই এই কাপড়টা দেয়া হোক না কেন তারা ছিলো যীশুর অনুসারী, আর সঙ্গত কারনেই তারা চেয়েছিলো এই অমূল্য স্মারককে সংরক্ষিত রাখতে। বিভিন্ন নথিপত্র ঘেঁটে পুরোহিতদের ভৃত্যদের মধ্যে দুজনের নাম বিশেষভাবে উঠে আসে, তাদের একজন ছিলো আরমেথিয়ার যোশেফ এবং নিকোডিমাস, যারা যীশুর ক্রুশবিদ্ধ দেহ ক্রুশ থেকে নামিয়ে এনে পাহাড়ের গুহায় সমাধিস্থ করছিলো। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতিতে রোমান শাষকদের দ্ধারা নির্যাতিত হবার কারনে এই কাপড় ফিলিস্থিন বা আশেপাশে রাখা যীশুর অনুসারীরা মোটেও নিরাপদ ভাবলেন না। তারা এটাকে উত্তরের প্রতিপত্তিশালী খ্রীষ্টান সম্প্রদায় যারা অ্যান্টিওখ, কোরিন্থ, এফিসাস অথবা এডেসাতে বসবাস করতেন তাদের কাছে পাঠিয়ে দেয়।
৩২৫ খ্রীষ্টাব্দে চার্চ বিষয়ক ঐতিহাসিক ক্যাসারিয়ার বিশপ ইউসেবিয়াস ( ২৬০-৩৪০ খ্রীষ্টাব্দ) জানান যে যীশু এবং এডেসার রাজা পঞ্চম এ্যাবাগার উক্কামা (দ্যা ব্ল্যাক)র মাঝে চিঠিপত্রের আদান প্রদান হয়েছিলো। ইউসেবিয়াসের লেখা থেকে আরো জানা যায়, তিনি নিজে এডেসিয়ান মাহাফেজখানায় রক্ষিত এই সব চিঠি প্রাচীন এ্যারামেয়িক থেকে গ্রীকে অনুবাদ করেছিলেন। রাজনৈতিক ভাবে এডেসা এ্যাবাগার বংশের অধীনে খ্রীষ্টপূর্ব ১৩২ থেকে ২১৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো। ইউসেবিয়াসের লেখা থেকে জানা যায় যে, রাজা পঞ্চম এ্যাবাগার উক্কামা জেরুজালেমে যীশুর কাছে দুত পাঠিয়েছিলেন তার চুলকানির উপশমের জন্য। যীশু নিজে যেতে না পারলেও থাড্ডিয়াস (এ্যারামিক ভাষায় “অ্যাড্ডাই”) নামে তাঁর এক শিষ্য কে একটা চিঠি দিয়ে পাঠান, তাতে তিনি উল্লেখ্য করেন যে এই শিষ্যই (থাড্ডিয়াস) তাকে সুস্থ্য করে তুলবে এবং তার শহরকে কোন এক আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করবে। পঞ্চম এ্যাবেগার উক্কামা কে থাড্ডিয়াস সুস্থ্য করার পর এডেসায় রাজা সহ প্রায় সব নাগরিক যীশুর প্রতি বিশ্বাস আনেন। ‘ডকট্রিনা অ্যাড্ডাই’ তে থাড্ডিয়াসের ধর্মোপদেশের সময়কাল পরিস্কার উল্লেখ্য আছে, এডিসান গননা অনুযায়ী সে সময়টা বছর ৩৪৩ অথবা খ্রীষ্টীয় ৩৩ সাল, যে সালে যীশুকে ক্রশবিদ্ধ করা হয়েছিলো।
সে সময় কাফনের কাপড় অশুভ বলে পরিগনিত হতো, তাই থাড্ডিয়াস কাপড়টাকে কয়েক ভাঁজে ভাঁজ করে তার এডেসীয় সহধর্মী এ্যাগাই এর সহযোগিতায় একটি সোনার ফ্রেমে বাঁধাই করে দেন। ১১০ সেমি লম্বা ৫৪.৫ সেমি প্রস্থ বিশিষ্ট সোনার ফ্রেমে বাঁধাই করা ওই কাপড়টায় শুধু যীশুর মুখই দেখা যেতো। ৯৪৫ সালের কনসষ্ট্যান্টিপোলের ভাষন অনুযায়ী উক্কামা নগর তোরনে ওই সোনা দিয়ে বাঁধানো প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়। এরপর ৫০ খ্রীষ্টাব্দে অ্যাবাগার মারা গেলে তার ছেলে পঞ্চম মা’নু সাত বছর দেশ শাসন করে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর এ্যাবাগারের দ্বিতীয় পুত্র সপ্তম মা’নু দেশ শাসন করেন। তিনি খ্রীষ্ট ধর্ম ছেড়ে প্যাগান ধর্মে ফিরে গিয়ে খ্রীষ্টানদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালান। ৯৪৫ খ্রীষ্টাব্দের কনসষ্ট্যান্টিপোলের ভাষন অনুযায়ী সে সময় এডেসার খ্রীষ্টধর্মের নেতা ছিলেন এ্যাগাই, তিনি প্রতিকৃতিটি তোরনের ফাঁকা স্থানে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সপ্তম মা’নু প্রতিকৃতিটি খুঁজে না পেয়ে এ্যাগাইসহ অনেক খ্রীষ্টান ধর্ম অনুসারীকে হত্যা করেন, সেটা ছিলো ৫৭ খ্রীষ্টাব্দে। এরপর প্রায় ৫০০ বছর এই প্রতিকৃতির কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
এরপর ৫৯৩ খ্রীষ্টাব্দে চার্চ বিষয়ক ঐতিহাসিক ইভাগ্রিয়াসের ভাষ্যে কাপড়টার উল্লেখ্য পাওয়া যায়। ইয়ান উইলসন ব্যাখ্যা করেন, ৫২৫ খ্রীষ্টাব্দে এক ভয়ংকর বন্যার পর সম্রাট জাষ্টিনিয়ানের আদেশে এডেসা পুর্নগঠনের সময় ফ্রেমে বাঁধানো আলখাল্লাটি আবার পাওয়া যায়। বিশপ ইউলেসিয়াসের ভাষায়, “খুজে পাওয়া প্রতিকৃতিটা নিশ্চিতভাবে কোন মানুষ্য সৃষ্টি না”। এরপর এই প্রতিকৃতিটা একটা রূপার সিন্দুকে হাজিয়া সোফিয়া ক্যাথেড্রালে নিয়ে আসা হয়। এখানে এসেই এই এডেসার প্রতিকৃতি বা ‘শ্রাউড অভ তুরিন’ “ম্যান্ডিলিয়ন” নামে অভিহিত হয়। যা অত্যন্ত পবিত্র এক ধর্মীয় উপকরন হিসাবে স্বীকৃতি হয়।
৬৩৯ সালে আরবরা এডেসা দখল করে নিলে কাপড়াটাও তাদের দখলে আসে। জনৈক ধনাঢ্য খ্রীষ্টান গিমিয়া পরিবারের এ্যাথেনসিয়াস এটা আরবদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে শহরের ভুগর্ভস্থ কোন এক চার্চে লুকিয়ে রাখে। এই সময় এটি “ম্যান্ডেলিয়ান” নামে সবার কাছে পরিচিতি লাভ করে। ষষ্ঠ শতকে ম্যান্ডেলিয়ান আবিস্কারের পর খ্রীষ্টের আঁকা অবয়বেরও পরিবর্তন আসে। এর আগে খ্রীষ্টের আঁকা ছবি ছিলো তরুন, দার্শনিক, সম্রাট; আবার কখনো অজাতশ্মশ্রু মেষপালক হিসাবে। কিন্তু ম্যান্ডেলিয়ন আবিস্কারের পর এর ওপরে প্রাপ্ত প্রতিকৃতির সাথে সামঞ্জ্যস্যপূর্ন করে শ্মশ্রু মন্ডিত খ্রীষ্টের ছবি আঁকা শুরু হয়। অষ্টম শতকে, তৃতীয় লিও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজা হন। তিনি ছিলেন প্রতিমা বিরোধী। এজন্য এডেসাবাসী লিও সিংহাসনে বসার সাথে সাথেই ম্যান্ডেলিয়ন’কে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ফেলে। এর ষাট বছর পর প্রতিমা বিরোধীরা চার্চ কর্তৃক আনুষ্ঠানিক ভাবে তিরস্কৃত হলে ম্যান্ডেলিয়ন’কে কনস্টান্টিনোপলে নিয়ে আসার জোর প্রচেষ্টা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সম্রাট রোমানাস লিকাপিনাসের শাসন কালে ৯৪২ সালের ১৫ ই আগষ্ট ‘শ্রাঊড অফ তুরিন’ বা ম্যান্ডেলিয়ন’কে কনস্টান্টিনোপলে নিয়ে আসা হয় এবং পরবর্তী ২৫০ বছর ব্লাচারনাই চার্চে তা সংরক্ষিত হয়। পরবর্তীতে এই ঐতিহাসিক সামগ্রীটি রক্ষার দায়িত্ব ছিলো ইউরোপের সিক্রেট সোসাইটি ‘দ্য নাইট টেম্পলার’ দের উপরে।
৫
‘শ্রাউড অফ তুরিন’ বা কাফনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
১৯৬৯ সালে তুরিনের কার্ডিনাল প্যালেগ্রিনো এগারোজন বৈজ্ঞানিকের সমন্বয়ে একটি প্যানেল গঠন করে একটি আধুনিক অনুসন্ধানের অনুমতি দেন। সে অনুসন্ধানের ফলাফল এত ব্যাপক যে পরে এর সাথে তুরিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং নাসা যুক্ত হয়। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৬৯ সালের কমিশন যে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তা গোপনীয়তার বেড়াজালে আটকা থাকে, এমনকি কমিশনের সদস্যদের নাম পর্যন্ত প্রকাশ করা হয় নাই। ১৯৮৮ সালে জুরিখ, অক্সফোর্ড, আর টুকসান বিশ্বাবিদ্যালয় অক্টোবরে কাপড়ের কার্বন-১৪ টেষ্টের রেজাল্ট প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায় কাপড়টি ১২৬০-১৩৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ের। এখানেই শুরু হয় আর এক নাটক, যে কাপড়ের অস্তিত্ত্ব মধ্যযুগের আগেও ছিলো তা কিভাবে মধ্যযুগের তৈরী হয়! অনুসন্ধান কাজের পরিচালক ডঃ মিখাইল টিটে এই কাজের পরই অজ্ঞাতনামা বন্ধু এবং পৃষ্ঠপোষকের কাছ থেকে এক মিলিয়ন পাউন্ড অনুদান পান একটা নতুন অনুষদ খোলার জন্য। পরীক্ষার অব্যহত পরই তুরিনের কার্ডিন্যাল ব্যালিষ্টেরো অবসর নেন এবং এই বিষয়ে মুখ বন্ধ রাখেন।
এরপর এব্যাপারে অনুসন্ধানে নামেন জার্মান ধর্মতত্ত্বের প্রফেসর কারষ্টেন হোলগার। তিনি প্রায় তিন বছর অনুসন্ধানের পর জানতে পারেন যে কার্বন-১৪ টেষ্টের জন্য যে কাপড় পাঠানো হয়েছিলো তা “ম্যান্ডেলিয়নের” ছিলো না, এটা ফ্রান্সে অবস্থিত সেইন্ট ম্যাক্সিমিন ব্যাসিলিকায় রক্ষিত সেইন্ট লুইস ডি আনজুর টুপি থেকে নেয়া হয়েছিলো, যা ১২৯৬ সাল থেকে সেখানে রক্ষিত আছে। এ থেকে প্রমানিত হয় তুরিনের কাফনের কাপড়ের সময়কাল প্রমানে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। চার্চের আসল উদ্দেশ্য ছিলো মধ্যযুগীয় জালিয়াতি হিসাবে তুরিনের কাফনের কাপড়কে প্রমান করা, কারন যীশু ক্রুশবিদ্ধ হবার পর বেঁচে ছিলেন কিনা সে প্রশ্ন কে ধামাচাপা দেয়া। এখানেই ‘গসপেল অফ বার্নাবাস’ এর সাথে খ্রীষ্টান ধর্মের অন্যান্য ধর্মীয় পুস্তকের অমিল এবং চার্চ এই পুস্তকটিকে স্বীকার করেনা।
হদিস:
১। বার্নাবাসের বাইবেল- আফজাল চৌধুরী
২। The Shroud of Turin- Ian Wilson
৩। ইন্টারনেট
পোস্ট ভিউঃ 6