সম্রাট অশোক- অহিংসা! নাকি হিংসার প্রতিচ্ছবি!!!

লেখালোক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য
সম্রাট অশোক- অহিংসা! নাকি হিংসার প্রতিচ্ছবি!!!

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে


বনলতা সেন কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ অশোকের ধূসর জগতের কথা বলেছেন। অশোকের জগতটা আমাদের কাছে আসলেই ধূসর থাকতো যদি জেমস প্রিন্সেপ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি নিয়ে ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় না আসতেন। এশিয়াটিক সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত প্রিন্সেপ ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বকে নতুন  জীবন দান করেন। অশোক সাধারণ মানুষকে বৌদ্ধধর্মে উদ্বুদ্ধ করার জন্য রাজ্যের বিভিন্ন স্হানে  (পাহাড়ের গায়ে, পাথরের স্তম্ভে, পবর্ত গুহায়) বুদ্ধের বাণী এবং উপদেশ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তার উপদেশ লিপিগুলো ‘অশোকলেখ’ নামে পরিচিত। উনিশ শতকে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও নেপালে পাথরের স্তম্ভের ওপর এসব অশোকলেখ আবিস্কৃত হলেও তার আগে কেউ এটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কিন্তু প্রিন্সেপ এই লিপিগুলোর রহস্য অনুসন্ধানে মাঠে নামলেন এবং ১৮৩৮ সালের মধ্যে বেশ কিছু লিপির অনুবাদ করতে সক্ষম হন। প্রিন্সেপের পর তার শিষ্য আলেকজান্ডার কানিং হাম মৌর্য যুগের ইতিহাস উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাদের মাধ্যমে উঠে আসে ঐ সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতার ছবি। জনগণ যেন শোষণের বিরুদ্ধে ফুঁসে না উঠে সেজন্য অশোক প্রত্যেক জনগোষ্ঠীকে সদুপদেশ দিতেন- রাজাকে পিতার মতো দেখতে, কারণ তিনি তাদের সন্তান জ্ঞান করেন। প্রিন্সেপের উদ্ধার করা লিপিগুলোতে এরকম অসংখ্য উক্তি পাওয়া যায়।


অশোকের ত্রয়োদশ শিলালিপিতে বর্ণিত হয়েছে যে, কলিঙ্গের যুদ্ধে প্রচুর মানুষের মৃত্যু এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনদের অপরিসীম কষ্ট লক্ষ্য করে অশোক দুঃখে ও অনুশোচনায় দগ্ধ হন। এই ভয়ানক যুদ্ধের কুফল লক্ষ্য করে যুদ্ধপ্রিয় অশোক শান্তিকামী ও প্রজাদরদী সম্রাটে পরিণত হন। তিনি ন্যাগ্রোধ শ্রমণের সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং একপর্যায়ে উপগুপ্ত নামক এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছে দীক্ষা নিয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। ন্যাগ্রোধ যে তার ভ্রাতুষ্পুত্র, সিংহাসনের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বড় ভাই সুষীমের সন্তান সেটা অবশ্য অশোক জানতেন না। অশোক তার ভাই বিগতাশোক’কেও বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণে উৎসাহিত করেন। তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে অহিংসার নীতি নিলেও প্রয়োজনে এ থেকে বিচ্যুত হতে কখনো  পিছপা হননি। তার সেনাবাহিনী সবসময়ই সুগঠিত ছিল। আসলে তার পিতামহের সময় থেকে দিগ্বিজয়ের যে রীতি, তিনি তাতে পরিবর্তন এনে ধর্মবিজয়ের নীতি গ্রহণ করেন। ধর্ম পূরণ করেছে তার রাজ্য জয়ের অভিলাষ। তবে এসব নিয়ে আলোচনার আগে অশোক সম্পর্কে জানা বেশি জরুরী।


২ 

খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৪ অব্দে ভারতের মৌর্য্য রাজবংশের তৃতীয় এবং ভারতবর্ষের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোকবর্ধন দ্বিতীয় মৌর্য সম্রাট বিন্দুসার এর ঔরসে ও রাণী ধম্মা’র (মতান্তরে চম্পাদেশীয় রাজকণ্যা  সুভদ্রাঙ্গীর, সুভদ্রাঙ্গী ব্রাহ্মণ বংশীয় ছিলেন) গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। অশোক তার মাতা সুভদ্রাঙ্গীর জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন, আর কনিষ্ঠ সন্তান হলেন বিগতাশোক বা তিষ্য। সম্রাট অশোক সম্বন্ধে জানার উৎস প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য এবং পুরাতত্ত্ব। সাহিত্য বলতে ‘দিব্যবদান’ এবং সিংহলী ইতিবৃত্তকে বোঝায়। ‘দিব্যবদান’ সংস্কৃত ভাষায় লেখা হয়েছে, ‘অশোকাবদান’ বা অশোকের জীবনী এরই অন্তর্ভুক্ত একটা অধ্যায়। সিংহলী ইতিবৃত্ত-এর দীপবংশ এবং মহাবংশ নামের দুটি গ্রন্থই পালি ভাষায় লেখা। ইতিহাসে তিশ্যারাক্ষ, পদ্মাবতী, কারুভাকী এবং বিদিশা নামে অশোকের চারজন স্ত্রীর কথা জানা যায়। কারুভাকী ছিলেন একজন জেলের কন্যা, যিনি বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে ভিক্ষুণী হয়েছিলেন। একটি শিলালিপিতে কারুভাকীকে রাজকুমার তিবলের মা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মনেকরা হয় যে, কারুভাকী ও তিবল সম্রাটের প্রিয় ছিলেন, কিন্তু সম্রাট অশোকের পূর্বে মৃত্যু হওয়ায় তিবল তার উত্তরাধিকারী হতে পারেননি।


সম্রাট বিন্দুসার মাত্র ১৮ বৎসর বয়সে অশোককে উজ্জ্বয়িনীর শাসনকর্তা হিসাবে নিয়োগ করেন।  তক্ষশীলাবাসী বিদ্রোহ ঘোষণা করলে সম্রাট বিন্দুসার তাকে বিদ্রোহ দমনের জন্য তক্ষশীলায় পাঠান। অশোক এই বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হলে বিন্দুসার তার হাতে তক্ষশীলার শাসনভার অর্পণ করেন। বৌদ্ধ কিংবদন্তী অনুসারে সম্রাট বিন্দুসারের ১৬ জন স্ত্রী এবং ১০১ জন পুত্র ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২৭২ অব্দে দ্বিতীয় মৌর্য্য সম্রাট বিন্দুসারের মৃত্যু হলে তার পুত্রদের মধ্যে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বিন্দুসার বড় সন্তান সুষীমকে উত্তারাধিকার হিসাবে চেয়েছিলেন, কিন্তু সুষীমকে উগ্র ও অহংকারী চরিত্রের মানুষ বিবেচনা করে বিন্দুসারের মন্ত্রীরা অশোককে সমর্থন করেন। অশোকাবদান অনুসারে বিন্দুসার অশোকের কুরূপের জন্য তাকে অপছন্দ করতেন। তার খরখরে শরীরের ত্বক কেউ স্পর্শ করতেও পছন্দ করতো না বলে জানা যায়। সিংহলী ইতিবৃত্ত দীপবংশ ও মহাবংশ গ্রন্থানুসারে বিগতাশোক নামে সহোদর ভাইটি ছাড়া অশোক তার বাকী ৯৯জন ভাইকে পরাজিত ও হত্যা করে পাটলিপুত্রের সিংহাসন দখল করেন। জানা যায় যে, অশোক শঠতা করে সৎভাই সুষীমকে একটি জ্বলন্ত কয়লা ভর্তি গর্তে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছিলেন। তিনি তার মন্ত্রীদের বিশ্বস্ততার ওপর সন্দেহ করে পাঁচশো জন মন্ত্রীকে হত্যা  করেন। তিনি বন্দীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন করার জন্য একটি বিশেষ কক্ষ নির্মাণ করিয়ে চন্ডগিরিক নামে একজন জল্লাদ নিয়োগ করেন। এছাড়া অশোকের কুৎসিত চেহারা নিয়ে উপহাস করায় হেরেমের পাঁচশো রমণীকে পুড়িয়ে হত্যা করেন। দিব্যবদান অনুসারে অশোক প্রথম জীবনে একজন বদমেজাজি ও ক্রূর প্রকৃতির লোক ছিলেন। তার এই ক্রূর স্বভাবের জন্য তাকে ‘চণ্ডাশোক’ নামে অভিহিত করা হতো।


সিংহাসনে বসে অশোক ‘দেবানাম-পিয়-পিয়দাসী’ অর্থাৎ দেবতাদের প্রিয় প্রিয়দর্শী এই উপাধি ধারণ করেন। ধারণা করা হয় তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩ অব্দের দিকে সিংহাসন লাভ করেন। কিন্তু তার সম্রাট হিসাবে অভিষেক হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৯ অব্দের দিকে, পিতার মৃত্যুর তিন বছর পরে। এই সময়টায় অশোক ব্যস্ত ছিলেন ভাইদের পরাস্ত করতে। রাধাগুপ্ত নামে এক মন্ত্রী অশোকের সিংহাসন লাভের পক্ষে সহায়ক ভূমিকা পালন করায় তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দেন। অশোক চাণক্যের মতো অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর সহযোগিতা না পেলেও চাণক্যের চিন্তা ভাবনা তখনো পুরো শাসন জুড়ে বিরাজিত ছিল। পুরো ভারতবর্ষকে একই শাসনের অধীনে রাখা মূলত চাণক্যের কৌশলেরই প্রতিফলন। সম্রাট অশোক নিজেও খুব কৌশলী ছিলেন বলে সুশৃঙ্খলভাবে মগধ শাসন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।


সিংহাসন লাভের পর নতুন লোভ পেয়ে বসে অশোককে, সেটা হলো সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তার। সম্রাট  অশোক পশ্চিমে আফগানিস্তান, পূবে বাংলাদেশ (মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত একটি শিলালিপির মাধ্যমে জানা যায়), উত্তরে আসাম, দক্ষিণে কেরালা এবং অন্ধ্র প্রদেশ অবধি এক সুবিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার রাজত্বকালে উত্তর বাংলার অনেকটা অংশ মৌর্যরা দখল করে সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত করে। মৌর্যদের শাসন ব্যবস্থা এককেন্দ্রিক হওয়ায় যেকোন বিষয়ে রাজকীয় কর্মচারীরা সম্রাট অশোকের কাছেই দায়বদ্ধ থাকতো, রাষ্ট্রের কাছে নয়। অশোক যুদ্ধবিগ্রহ, আমোদ-প্রমোদ, মৃগয়া ইত্যাদি খুব পছন্দ করতেন। বিদেশীদের সঙ্গে তার পিতামহ এবং পিতার মতো তিনিও সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। তুসাস্পা নামে তার এক পারসিক কর্মচারী ছিল। মৌর্য্য শাসন ব্যবস্থায় অন্যতম প্রতিষ্ঠান ছিল গুপ্তচর সংস্থা। কৌটিল্যের উপদেশ ছিল, গুপ্তচররা সন্নাসী, ভবঘুরে, গৃহী, বণিক, ছাত্র, চিকিৎসক, নারী ও যৌনকর্মীর ছদ্মবেশে কাজ করবে। গুপ্তচরের মাধ্যমে সম্রাট অশোক তার সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের খোঁজ খবর রাখতেন। তার লিপিগুলো উদারতার কথা বললেও তিনি গুপ্তচর সংস্থা কখনো বিলোপ করেন নি।


মৌর্য যুগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে ভারতবর্ষের অর্থনীতিতে। পুরো মৌর্য সাম্রাজ্যে একই ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু হয়। শুধু তাই নয় এই প্রথম পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থার চালু হয়। যা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গতিপথকে পাল্টে দেয়। মৌর্য শাসনামলেই রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে বহুবিদ কর আরোহণের নিয়ম চালু হয়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কৃষি জমিতে পানির সরবরাহের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়ে পানির উপর যে কর আরোপ করা হয়েছিল সেরকম প্রথা ইতিহাসে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। জমির উপরে ল্যান্ড ট্যাক্স নামক এক ধরনের ট্যাক্স আরোপ করা হয়। বেশি উর্বরা জমির উপর ট্যাক্সের পরিমাণ ছিল বেশি, কম উর্বরা জমির উপর এই ট্যাক্সের পরিমাণ ছিল কম। এ সময় শিল্পের বিষয়টি ছিল বেশ উল্লেখযোগ্য। অর্থশাস্ত্রে প্রায় ১৮ ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ পাওয়া যায়। জানা যায় যে, প্রজাদের মঙ্গলের জন্য তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং জলকষ্ট দূর করার জন্য রাজ্যের বিভিন্ন স্হানে জলাশয় তৈরি করে দেন। তিনি চিকিৎসালয়ের পাশে বিশাল এলাকা জুড়ে ভেষজ উদ্ভিদের বাগানও তৈরি করান যাতে প্রয়োজনে মানুষ বা পশুপাখির জন্য তাড়াতাড়ি ঔষধ বানিয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়া সম্ভব হয়। দেশের বাইরে সুদূর গ্রীসেও তিনি মানুষ ও পশুদের জন্য চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন।


৪ 

সম্রাট অশোক তার রাজত্ব্যকালের অষ্টম বর্ষে অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ২৬১ অব্দের দিকে কলিঙ্গ (বর্তমানে ভারতের  উড়িষ্যায়) রাজ্য আক্রমণ করেন। তার এক্ষেত্রে দুটি উদ্দেশ্য ছিল; প্রথমত সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ, এই  একটি রাজ্য ছাড়া ভারতবর্ষের একটা বৃহৎ অংশ তার সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল আর দ্বিতীয় কারণটি ছিল  বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক। ততোদিনে নগরায়নের সাথে সাথে সমাজে ব্যবসায়ীদের প্রভাব প্রতিপত্তি যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল। তিনি নিজেও উজ্জয়িনীতে থাকার সময়ে ‘দেবী’ নামে বিদিশার এক শ্রেষ্ঠী কন্যাকে বিয়ে করেন, মহেন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রা তাদের সন্তান। সমুদ্র তীরবর্তি কলিঙ্গ রাজ্য বেশ শক্তিশালী এবং দক্ষিণ ভারতের জলপথগুলি তাদের দখলে ছিল। তাই নিজের ইচ্ছে এবং বণিকশ্রেনীর স্বার্থরক্ষা, উভয় কারণেই কলিঙ্গ দখল করা দরকার হয়ে পড়ে। দয়া নদীর তীরে ধৌলি পাহাড়ের পাদদেশে দু'পক্ষের মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে কলিঙ্গবাসী সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরও পরাজিত হয়। প্লিনির বিবরণ অনুযায়ী, এ সময়ের কলিঙ্গে ৬০,০০০ পদাতিক, ১,০০০ রথারোহী ও ৭০০ রণহস্তী বিশিষ্ট এক শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ছিল। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এরকম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কথা খুবই কম শোনা যায়। এই যুদ্ধে সম্রাট অশোক পূর্ণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সেসময় তার সেনাবাহিনীতে ৪ লক্ষের  বেশি সৈন্য ছিল, যুদ্ধে এক লক্ষ সৈন্য মারা যায়। অন্য দিকে ঠিক প্রায় একই পরিমান কলিঙ্গ যোদ্ধাও প্রাণ হারায়। বলা হয় যে, কলিঙ্গ যুদ্ধের কারণে সৈন্যদের রক্তে দয়া নদীর পানি লাল হয়ে যায় এবং প্রায় দেড় লক্ষ কলিঙ্গবাসী বন্দী অথবা নির্বাসিত হয়েছিল। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে, কলিঙ্গ যুদ্ধের পরে এই নির্বাসিত জনস্রোতের একটা অংশ উত্তরের পথ ধরে প্রাচীন বাংলার উপকূলীয় এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল।


যুদ্ধের পরে সম্রাট অশোক এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছদ্মবেশে বেড়াতে থাকেন, কিন্তু কান্না ছাড়া আর কিছুই তার চোখে পড়েনি। বৃদ্ধা মা তার মৃত পুত্রের লাশ নিয়ে কাঁদছে, অসহায় ছেলে তার পিতার লাশ নিয়ে কাঁদছে, গৃহবধু তার স্বামীর লাশ নিয়ে কাঁদছে। চারদিকে শুধু লাশের সারি। তবে কলিঙ্গ জয়ের পর অনুতপ্ত হলেও অশোক কলিঙ্গবাসীকে তাদের রাজ্য ফিরিয়ে দেননি। তাছাড়া যে মানুষগুলোর কান্না অশোকের মনের বরফ গলিয়ে ছিল সেই মানুষগুলোকে অশোক বুদ্ধের একরাশ বাণী ছাড়া আর কিছুই দেননি। তিনি সাধারণ মানুষের মাথার উপর থেকে মাত্রাতিরিক্ত করের পরিমাণ বিন্দুমাত্র কমাননি। বরং  বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পরেও চাণক্যের অর্থনৈতিক ফর্মুলা সুচারুভাবে প্রয়োগ করে গেছেন।


৫ 

সম্রাট অশোক গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর ২২৪/২২৫ বছর পরে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হবার পর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সম্মান করার জন্য তিনি তার মন্ত্রী যশস’কে নির্দেশ দেন। এরপর দীক্ষাগুরু উপগুপ্তকে সাথে নিয়ে কপিলাবস্তু, লুম্বিনী, কুশীনগর, বুদ্ধগয়া ইত্যাদি গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে জড়িত স্থানগুলিতে তীর্থ করতে বেরিয়ে পড়েন। বৌদ্ধধর্ম গৌতম বুদ্ধের সময়কালেই সৃষ্টির উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছিল এবং সংঘগুলোও দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তবে এই দুর্নীতি অধিকাংশ মানুষের কাছেই অজানা ছিল। কারণ বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নির্বাণ লাভ নামক এক ভাববাদী জগতে মানুষকে ডুবিয়ে রাখতেন। এরকম সময়ে অশোকের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ পুরো বৌদ্ধধর্মের মোড় পাল্টে দেয়। সম্রাট অশোক দূত পাঠিয়ে বিভিন্ন রাজ্যের রাজাদের কাছে যুদ্ধ নয়, শান্তির বাণী পাঠাতে লাগলেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় এশিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হয়। তার ধর্মীয় অনুরাগের কারণে এসময় তাকে ‘ধর্মাশোক’ নামে অভিহিত করা হতো।


অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছেন নিজ উদ্যোগে কিন্তু এই ধর্মকে ছড়িয়ে দিতে তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ব্যাপক অর্থ ব্যবহার করেছেন। অশোক ৮৪ হাজার বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়া বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ ব্যয় করে খাবার দিতেন। তৎকালীন প্রায় ৬০ হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষুকে অশোক নিয়মিত খাবার সরবরাহ করতেন। এই অর্থ সম্রাট অশোকের ব্যক্তিগত অর্থ ছিলনা, সাম্রাজ্যের হতভাগা মানুষকেই বহন করতে হতো এসবের দায়ভার। শেষ জীবনে অশোক রাজকোষের সম্পদ সংঘগুলিকে দান করতেন। এক পর্যায়ে তিনি সমস্ত সম্পদ দান করে দেবেন এই ভয়ে তার মন্ত্রীরা তাকে রাজকোষে ঢুকতে বাধা দিতেন। তিব্বতীয় কিংবদন্তী অনুসারে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৩২ অব্দে সম্রাট অশোক তক্ষশীলায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর ৫০ বছরের মধ্যে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।


অশোক তার ধর্মীয় নীতিকে ‘ধম্ম’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এই ‘ধম্ম’ প্রচারে তিনি ‘অনারম্ভ প্রাণায়াম’ (প্রাণিহত্যা না করা) এবং ‘অভিহিশ ভূতানাম’ (জীবিত প্রাণীর ক্ষতি না করা) নীতি গ্রহণ  করেন। অনেকের মতে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই অশোক অহিংসা নীতি গ্রহণ করেছিলেন। কেননা অশোকের সময়ে মৌর্য্য রাষ্ট্রে শ্রেণির উদ্ভব হয়েছিল এবং কৌটিল্যকে যে সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি অশোককে তাই হতে হয়েছিল। এই সমস্যাটি ছিল বিভিন্ন শ্রেণির মাঝে স্বার্থের সংঘাত এড়ানো। এক্ষেত্রে সম্রাট অশোকের অন্যতম হাতিয়ার ছিল তার প্রবর্তিত ‘ধম্ম’। ধম্মের মধ্যে শাসক এবং প্রজা সাধারণ অভিন্ন কাতারে এসে মিলেছিল। ১৫৮২ সালে মুঘল বাদশাহ আকবরকেও ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র মাধ্যমে একই পন্থা অনুসরণ করতে দেখা যায়। মৌর্য্যযুগে সাধারণ মানুষের জীবনধারায় মৌলিক পরিবর্তন ঘটছিল, আগে এই জীবনধারা ছিল যাযাবর এবং পশুচারণ ভিত্তিক। নতুন আর্যসংস্কৃতি ছিল অপেক্ষাকৃত স্থির এবং নগরকেন্দ্রিক। নগরজীবন সংহত করার জন্য প্রয়োজন ছিল সুর্নিদিষ্ট সামাজিক সংগঠনের। তাছাড়া মৌর্য্য সমাজটি ছিল জটিল। এই সমাজে একদিকে বণিক শ্রেণি নতুন স্বীকৃতি অর্জন করতে চেয়েছিল, আবার ব্রাহ্মণরা এই জটিলতা অবসানের জন্য সমাজে জাতিভেদ প্রথা কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছিল। অপরদিকে বৌদ্ধধর্মে একটি বিশ্বজনীন এবং সামাজিক সচেতনতার দিক রয়েছে, যেটি অশোক উপলব্দি করেছিলেন।


মৌর্য্য সাম্রাজ্য ছিল কেন্দ্রীয় শাসনভিত্তিক এবং তা সুসংহত করতে সম্রাট অশোকের সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা ছিল, কৌটিল্যের নির্মম নীতি গ্রহণ করা অথবা নতুন ধর্মমত প্রচার। রাজনৈতিক দিক থেকে ‘ধম্ম’ গ্রহণ করে অশোক জনগনের উদার সহনশীল অংশের সমর্থন লাভ করতে চেয়েছিলেন। এই অংশে বণিক শ্রেণি থাকায় তাদের সমর্থন অশোকের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও সাম্রাজ্যের ভেতরে বহুতর বৈষম্য ছিল। কিন্তু নতুন ধর্মমত গ্রহণ ও প্রচারের মাধ্যমে সম্রাট অশোক প্রয়োজনীয়  বন্ধনগ্রন্থি খুঁজে পেয়েছিলেন। তার উদ্যোগে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সংহতি স্থাপনের জন্য এবং বৌদ্ধ সংঘসমূহের ভিতরে আন্তঃসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য পাটলিপুত্র নগরে একটি বৌদ্ধ সংগীতি অর্থাৎ তৃতীয় সংগীতি আহ্বান করা হয়। তিনি সিরিয়া, মিশর, থাইল্যান্ড, নেপাল, মায়ানমার প্রভৃতি দেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় পুত্র মহিন্দ্র এবং কন্যা সংঘমিত্রা’কে সিংহলে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য পাঠিয়েছিলেন। ধর্ম প্রচারের জন্য অশোক ‘রাজুক, যুত এবং মহামাত্র’ নামক পদের সৃষ্টি করেছিলেন। মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত এক শিলালিপি থেকে জানা যায়, পুন্ড্রনগর ছিল ‘মহামাত্র’ নামক রাজকর্মচারীর শাসনকেন্দ্র।


৭  

সম্রাট অশোক-এর বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হলেও তার প্রবর্তিত নতুন ধর্মমত ‘ধম্ম’ আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেয়া পদক্ষেপ। ধর্মের বাতাবরণে তার শাসন ব্যবস্থাকে সুসংহত করার একটা  প্রচেষ্টা। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যর মতো সৌভাগ্য তার ছিলনা, কিংবা চাণক্যের মতো বিশ্বস্ত সহচর, পরামর্শদাতা বা গুরু তিনি পাননি। আর তাই ধর্মের টনিক তার অভিষ্ট লক্ষ্য পূরণে বেশ সহায়ক হয়েছিল। আসলে প্রাচীন সুমেরিয়ান সভ্যতা থেকে আজ পর্যন্ত, যুগযুগ ধরে ধর্ম সবসময়ই রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আপন স্বার্থ হাসিলে উপাসনালয় এবং সিংহাসন সবসময়ই একে অপরের পাশে থেকেছে। অহিংসার নীতি প্রচার করে যে বৌদ্ধধর্মের আবির্ভাব সেই ধর্মে ধর্মান্তরিত হলেও ব্যক্তিগত জীবনে তার যে বদমেজাজি ও ক্রুর স্বভাব, যে কারণে তাকে চণ্ডাশোক বলা হতো, তার তেমন পরিবর্তন হয়নি। এক্ষেত্রে কলিঙ্গ যুদ্ধ বা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের পরের দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।


দিব্যাবদান-এ মোট ৩৮টি কাহিনী রয়েছে, এরমধ্যে ‘বীতাশোকাবদান’ অংশ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দের  একটি রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে জানা যায়। সেসময়ে পুণ্ড্রবর্ধনে বসবাসরত আজীবিক ধর্মীয়  সম্প্রদায়ের মধ্যে চিত্রকলার বেশ প্রচলন ছিল, এক অর্থে তারা ছিল পটুয়া সম্প্রদায়। তারা এক চিত্রকর্মে বুদ্ধদেব তাদের ধর্মীয় গুরু মক্ষলি গোশালকে প্রণতি জানাচ্ছেন, এরকম একটি ছবি আঁকায় তা সম্রাট  অশোকের কান অবধি পৌঁছায়। সম্রাট অশোক আজীবিকদের এরকম ঔদ্ধত্যে ক্রুদ্ধ হয়ে সেসময়ে পুণ্ড্রবর্ধনে বসবাসরত আজীবিক সম্প্রদায়ের সমস্ত মানুষদের হত্যার নির্দেশ দেন, যার ফলে প্রায় ১৮,০০০ মানুষ নিহত হন। আরেক জায়গায় গল্পটা এরকম পাওয়া যায়, অশোকের সময়ে তীর্থক ও জৈন সম্প্রদায় অত্যন্ত প্রবল অবস্থায় ছিল। সম্রাট অশোকের ভাই তিষ্য বৌদ্ধধর্মে আস্থাবান না থাকায় অশোকের বিরাগভাজন হন এবং পালিয়ে পুণ্ড্রবর্ধনে যান। সেখানে তীর্থকদের সাথে মিলে প্রকাশ্যে বুদ্ধের নিন্দা করতে থাকেন। ভাইএর এরকম আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ভাইকে হত্যা করতে নির্দেশ দেন। এসময় তাকে জানানো হয় যে পুণ্ড্রবর্ধনের আজীবিকরাই সব ষড়যন্ত্রের মূল হোতা। তখন সম্রাট অশোক রাগান্ধ হয়ে আজীবিকদেরকে ধ্বংস করতে নির্দেশ দেন। তার এই আদেশে এক দিনে ১৮,০০০ আজীবিক সম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যা করা হয়। এভাবে কলিঙ্গ যুদ্ধের পর দয়া নদীর মতো করতোয়া বা সদানীরা নদীর পানিও   রক্তে লাল হয়ে যায়। আরেকটা ঘটনা এরকম, পাটলিপুত্র নগরীর এক জৈন ধর্মাবলম্বী অনুরূপ একটি চিত্র অঙ্কন করলে অশোক তাকে সপরিবারে জীবন্ত অবস্থায় অগ্নিসংযোগ করে হত্যা করেন এবং কোন ব্যক্তি জৈন ধর্মাবলম্বীদের কর্তিত মস্তক এনে দিতে পারলে তাকে একটি করে রৌপ্য মুদ্রা দেয়ার কথা ঘোষণা দেন। এই আদেশের ফলে ভুলক্রমে এক পশুপালক তার সহোদর ভাই বিগতাশোক’কে জৈন সন্ন্যাসী ভেবে হত্যা করেন। এভাবে তার সহোদর বিগতাশোক বা তিষ্য মৃত্যুবরণ করেন।


৮ 

ইতিহাস বলে, মানুষ আসলে বদলায় না। জন্মের পর থেকে একজন মানুষ যেভাবে বা যে পরিবেশে বেড়ে  ওঠে সময়ের প্রতিটি বাঁকে সেভাবে সে তার জীবনের স্বাক্ষর রেখে যায়। ধর্ম-শাস্ত্র-শিল্পকলা কখনো কখনো হয়ে ওঠে তার লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার। ষড়রিপু’র তাড়নায় মানুষ তার অভিলাষ বা স্বার্থের প্রয়োজনে কিনা করতে পারে! সম্রাট অশোকের জীবন থেকে তার কিছুটা বোঝা যায়। লেখা শেষ করবো ওল্ড টেস্টামেন্ট-এর একটা বানী দিয়ে,


Can an Ethiopian change his skin, or a leopard its spots?

Neither can you do good, who are accustomed to doing evil.’  

                                                        [Jeremiah 13:23]




হদিসঃ

১। মৌর্য সম্রাট প্রিয়দর্শী অশোক- শানজিদ অর্ণব  

২। মহাসম্রাট অশোক- ড. জিতেন্দ্র লাল বড়ুয়া  

৩। মহাস্থান- মোঃ মোশারফ হোসেন ও মোঃ বাদরুল আলম 

৪। পৌণ্ড্রবর্ধন ও করতোয়া- শ্রী হরগোপাল দাসকুণ্ডু 

৫। ইন্টারনেট    



পোস্ট ভিউঃ 5

আপনার মন্তব্য লিখুন