স্বপ্ন, মৃত্যু, ভালোবাসা

লেখালোক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য
স্বপ্ন, মৃত্যু, ভালোবাসা

২৪ নভেম্বর ১৯৭৪। 

গফুর মেম্বারের বাড়ি, যাত্রাবাড়ী ঢাকা।


২৬ নভেম্বর ১৯৭৪ তারিখে ডাকা হরতালের প্রস্তুতি উপলক্ষে ঢাকা শহরে একটা শক্তির মহড়া দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এজন্য কিছু হাতবোমা দরকার, দায়িত্ব নেন লিখিল চন্দ্র সাহা। তিনি বুয়েটের একজন স্নাতক, কিছুদিন আগে যন্ত্রকৌশল বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছেন। ১৯৬৯ সাল থেকেই ছাত্রলীগের সিরাজ গ্রুপের সাথে জড়িত, পরবর্তীতে জাসদে যোগ দেন।


নিখিল এর আগেও হাতবোমা বানিয়েছেন, তবে পদ্ধতিটা খুব স্থূল। নিখিল তার দুই সহযোগী, গোলাম মোরশেদ নয়ন এবং কাইয়ুমকে নিয়ে বোমা বানানো শুরু করেন। বেশ কয়েকটা বোমা বানানো হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ দূর্ঘটনা ঘটে, ভুলবশত একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। এরপর তৈরী হয়ে যাওয়া একে একে অনেকগুলো। কাইয়ুম ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। মারাত্মক আহত হন নিখিল, তার শরীরের বেশ কিছু অংশ ঝলসে যায়। নয়ন নিখিলকে কাঁধে নিয়ে প্রথমে পোস্তাগোলা যেয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।


২৫ নভেম্বর ১৯৭৪।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


গণবাহিনীর সদস্য বাদল খান নিখিলকে দেখতে যান। নিখিল তাকে সতর্ক করে বলেন, ‘আমার ডায়েরিটা সম্ভবত পুলিশের হাতে পড়েছে। রাতে বাড়িতে থেকো না।’ নিখিলের শরীর এমনভাবে পুড়েছিল যে তার বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ, ২৬ নভেম্বরে হাসপাতালেই তার মৃত্যু ঘটে। তবে এও ধারণা করা হয় যে, নিখিলের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পুলিশের হাতে যাবে বলে জাসদই তাকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করায়।


পোস্তাগোলা শ্মশানে তার মৃতদেহ দাহ করা হয়। নিখিলদের বাড়ি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার বিটনগর গ্রামে। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান, তার বাবা ছিলেন একজন খেতমজুর।


নিখিলের মৃত্যুর সাথে সাথে একটা পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে।


কাইয়ুমের ঘটনাটাও বেশ করুন। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে।


কাইয়ুমের বাবা সরকারি চাকুরী করতেন, থাকতেন পলাশী সরকারি কোয়ার্টারে। রেডিওতে খবর শুনে তার মা গফুর মেম্বারের বাড়ির কাছে যান। সরকারি চাকুরী ও কোয়ার্টার নিয়ে ঝামেলা হতে পারে বলে তিনি কাইয়ুমকে নিজের ছেলে বলে পরিচয় দেয়া বা লাশ নিয়ে আসার সাহস পাননি। জাসদের পক্ষ থেকেও কেউ যে এগিয়ে আসবে এমন কাউকে পাওয়া যায়নি।


মানুষের জটলার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছেলের লাশ দেখেছিলেন শুধু। আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে তার লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।


কখনো কখনো বাস্তবতার কাছে মায়ের ভালোবাসাও হার মানে।



হদিসঃ 

১। জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি- মহিউদ্দিন আহমদ 

২। রুম নাম্বার ১৪৬- শওকত আহসান ফারুক 

৩। ইন্টারনেট 



পোস্ট ভিউঃ 29

আপনার মন্তব্য লিখুন