হোলি গ্রেইল বা যীশুর পানপাত্র

লেখালোক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য
হোলি গ্রেইল বা যীশুর পানপাত্র

Love me like you do, lo-lo-love me like you do

Touch me like you do, to-to-touch me like you do

What are you waiting for?

Fading in, fading out

On the edge of paradise

Every inch of your skin, is a Holy Grail I've gotta find  

Only you can set my heart on fire, on fire


Fifty Shades of Grey সিনেমার বিখ্যাত গান, গেয়েছেন Ellie Goulding। লিরিক এর ষষ্ঠ লাইনের দিকে তাকালে ‘Holy Grail’ শব্দের দিকে চোখ পড়বে। এখন প্রশ্ন আসে ‘হোলি গ্রেইল’ আসলে কি? ‘হোলি গ্রেইল’ হলো অসংখ্য পৌরাণিক কাহিনী এবং কিংবদন্তীর বিষয়, যা সত্যকে কথাসাহিত্য থেকে আলাদা করা কঠিন করে তোলে। ‘গ্রেইল’ শব্দটি লাতিন শব্দ ‘গ্রেডেল’ থেকে এসেছে, যা মধ্যযুগে বনভোজনে   খাবার পরিবেশনের সময় ব্যবহার করা একধরণের গভীর থালাকে বোঝায়। বছরের পর বছর ধরে, ‘হোলি গ্রেইল’কে একটি থালা, সিবরিয়াম, চালেস, গবলেট এমনকি একটি পাথর হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।


খ্রিষ্টধর্ম মতে ‘লাস্ট সাপার’ অর্থাৎ সবচেয়ে কাছের বারোজন শিষ্যকে নিয়ে যীশু শেষবারের মতো যে   নৈশভোজ করেছিলেন, তাতে এই পেয়ালাতেই তিনি চুমুক দিয়েছিলেন। এরপর জুদাস ইস্কারিও নামে এক শিষ্যের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি ধরা পড়েন রোমান সৈন্যদের হাতে। তবে গসপেল অফ বার্নাবাস অনুযায়ী যীশুকে নৈশ ভোজের পরপরই ফেরেশতাদের পাঠিয়ে স্বর্গে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং জুদাসের চেহারা ও কণ্ঠস্বর যীশুর মতো করে দেয়া হয়। এরফলে পীলাতের সৈন্যরা জুদাস ইস্কারিওকে প্রকৃত যীশু মনেকরে ধরে নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে তাকেই ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। যাহোক ক্রুশবিদ্ধ করার ঘটনার পর থেকে যীশুর শেষ চুমুক দেয়া পেয়ালাটিকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়িয়েছেন ইতিহাস অনুরাগী গবেষকের দল। সম্প্রতি দুজন স্প্যানিশ গবেষক এটি খুঁজে পাওয়ার দাবী করেছেন, তবে সে গল্পে পরে আসছি।


মধ্যযুগের কবি, সাহিত্যিক, নাইটদের থেকে শুরু করে বর্তমান যুগের ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ,  ঔপন্যাসিক, চলচ্চিত্র পরিচালকদের অনেকের গবেষণা বা সৃষ্টিকর্মে ‘হোলি গ্রেইল’ এর প্রসঙ্গ এসেছে বিভিন্ন ভাবে। গত দুই শতাব্দী ধরে ‘হোলি গ্রেইল’ এর কিংবদন্তী আরো মুখরোচক হচ্ছে, সাধারণ  জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্য তৈরি করা হচ্ছে কল্পিত ইতিহাস সমৃদ্ধ বই ও চলচ্চিত্র। অনেক   ইতিহাসবিদের মতে, শুধুমাত্র ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে লেখক আর ফিল্ম মেকাররা ‘হোলি গ্রেইল’কে  ব্যবহার করছেন অসংখ্য বার। চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ১৯৭৫ সালে তৈরি ‘মন্টি পাইথন অ্যান্ড দ্য হলি গ্রেইল’ মুভিতে দেখা যায় রাজা আর্থারের নাইটরা ‘হোলি গ্রেইল’ এর পেছনে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। এর ঠিক ৬ বছর পর, ১৯৮১ সালে বের হওয়া ‘এক্সক্যালিবার’ মুভিতে দেখা যায় পারসিফাল ‘হোলি গ্রেইল’ খুঁজে বের করে এবং তা থেকে অসুস্থ রাজা আর্থারকে পান করতে দেয়। এরফলে রাজা আর্থার সুস্থ হয়ে ওঠেন।  ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া বিখ্যাত মুভি ‘ইন্ডিয়ানা জোনস অ্যান্ড দ্য লাস্ট ক্রুসেড’ মুভিতে দেখা যায় ‘হোলি গ্রেইল’ এর পেছনে ছোটা নাৎসি বাহিনী আর প্রত্নতত্ত্ববিদ হ্যারিসন ফোর্ডের লড়াই। ১৯৯১ সালে মুক্তি পায় ‘ফিশার কিং’। এভাবেই ‘হোলি গ্রেইল’ নিয়ে অসংখ্য জনপ্রিয় বই আছে বাজারে, হলিউডের অসংখ্য মুভি আছে, আছে একগাদা কল্পকাহিনী আর আজগুবি সব কন্সপিরেসি থিওরি।


তবে ‘হোলি গ্রেইল’ কে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন সম্ভবত ড্যান ব্রাউন। তিনি একজন থ্রিলার লেখক। তার লেখা ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ উপন্যাসে ‘হোলি গ্রেইল’কে নিয়ে লেখা কাহিনীর পুরোটাই কল্পনাপ্রসূত। তিনি অবশ্য ‘হোলি গ্রেইল’কে পানপাত্র হিসাবে নয়, মেরি ম্যাগদালিনের গর্ভ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। বইটিতে বলা হয়েছে যে মেরি ম্যাগদালিন যীশুর সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, যা যীশুর একটি ব্লাড লাইন শুরু করেছিল। ‘হোলি গ্রেইল’ নিয়ে এত মাতামাতি করার কারণ বোধহয় এর আকৃতি, অবস্থান কিংবা অস্তিত্ব নিয়ে ধোঁয়াশাপূর্ণ ধারণা। খ্রিস্টানদের মধ্যে ‘হোলি গ্রেইল’ নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারণাটি হলো, এটি হচ্ছে একধরনের পানপাত্র যা যীশু তার ‘লাস্ট সাপারে’ ব্যবহার করেছিলেন। যার উল্লেখ রয়েছে ম্যাথিউ, মার্ক এবং লুকের গসপেলে। ইতিহাসবিদদের মতে গসপেল গুলো লেখা হয়েছিল ৮০ থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে।


যীশুর ব্যবহৃত জিনিস নিয়ে পশ্চিমা ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের আগ্রহ কম নয়। পৃথিবীজুড়ে কম করে হলেও ২০০টি গির্জা এবং  জাদুঘর দাবি করেছে যে তাদের কাছে রয়েছে আসল ‘হোলি গ্রেইল’। ড্যান ব্রাউনের ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ উপন্যাসে উল্লেখিত রোসালিন চ্যাপেলে রক্ষিত তথাকথিত ‘হোলি গ্রেইল’ দেখতে বছরে প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ ভিড় জমায়। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট জাদুঘর, স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া ক্যাথেড্রাল, ইতালির স্যান লরেঞ্জো ক্যাথেড্রাল, ফ্রান্সের চ্যাটু ডি মন্টসেগুর সহ অসংখ্য গির্জা দাবি করে তাদের কাছে রক্ষিত পানপাত্রটিই আসল ‘হোলি গ্রেইল’।


বিভিন্ন ক্যাথলিক গির্জা দাবি করে, তাদের কাছে আছে ‘শ্রাউড অফ তুরিন’ বা যীশুর কাফনের কাপড়, আবার অনেকে দাবি করেন তাদের কাছে ক্রুশবিদ্ধ করার সময় ব্যবহৃত কীলক গুলো রয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘হোলি গ্রেইল’, অনেকে বলেন যীশু যখন ক্রুশবিদ্ধ হচ্ছিলেন তখন অ্যারিম্যাথিয়ার জোসেফ এই পানপাত্রে যীশুর রক্ত ভরে রেখেছিলেন অর্থাৎ জোসেফ হচ্ছে ‘হোলি গ্রেইল’ এর প্রথম প্রধান রক্ষাকর্তা। ১১৯১ থেকে ১২০২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ফরাসি কবি রবার্ট ডি বোরোঁ তার জোসেফ ডি অ্যারিমাথিয়ে কবিতায় এই ঘটনা উল্লেখ করেছেন।


তবে ‘হলি গ্রেইল’ এর ঘটনাটা খ্রিস্টানদের মধ্যে জনপ্রিয় হয় যখন এর সাথে রাজা আর্থারের গল্পগুলো  মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। কিছু আর্থারিয়ান কাহিনী দাবী করে, অ্যারিমাথিয়ার জোসেফ ইংল্যান্ডের  গ্লাস্টনবারিতে ‘হোলি গ্রেইল’ নিয়ে এসেছিল। একটি জনশ্রুতি আছে যে তিনি যে স্থানে গ্রেইলকে কবর দিয়েছিলেন, সেখানে পানি লাল হয়ে যায় কারণ এটি খ্রিস্টের রক্তের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে। বিজ্ঞানীরা  অবশ্য বলেন এটি মাটিতে লাল আয়রন অক্সাইডের প্রভাব। মধ্যযুগে ‘হোলি গ্রেইল’ রক্ষা করতে গঠন  করা হয়েছিল বিভিন্ন গোপন সংগঠন, এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ফিশার কিং এবং নাইট টেম্পলার।


লিখিত আকারে ‘হোলি গ্রেইল’ এর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ফরাসি কবি ক্রিশ্চেন ডি ত্রোয়েসের কবিতায়।  ১১৮০ এর দশকে লেখা ‘কনটে দেল গ্রাল’ (‘গ্রেইলের গল্প’) নামে এই অসম্পূর্ণ কবিতায় কবি উল্লেখ করেছেন, পারসিফাল, রাজা আর্থারের একজন নাইট, ফিশার কিংদের আস্তানায় গিয়ে বিভিন্ন গোপন জিনিসের সন্ধান পায়, যার মধ্যে ‘হোলি গ্রেইল’ রয়েছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে জার্মান কবি ওলফ্রাম ফন এশেনবাখ তার Parzival কবিতায় তুলে ধরেছেন পারসিভাল নামক এক নাইটের কথা, যে ‘হোলি গ্রেইল’ উদ্ধার করার জন্য এক দুঃসাহসিক অভিযানে নেমেছে।


গুজব রয়েছে, ক্রুসেডের সময় সারাসেন বাহিনী যখন জেরুজালেমে প্রবেশ করে, তখন নাইট টেম্পলাররা এটি নিয়ে পালানোর সময় হারিয়ে ফেলে। পরবর্তীতে একে কোনোভাবে উদ্ধার করে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ‘হোলি গ্রেইল’ নিয়ে গুজবের অভাব নেই।


সম্প্রতি দুই স্প্যানিশ গবেষক নতুন করে উসকে দিয়েছেন গ্রেইল বিতর্ক। তাদের দাবী নতুন কোন  কন্সপিরেসি থিওরি নয়, তারা গ্রেইলের ইতিহাস খুঁজে বের করার পাশাপাশি পেয়ালাটি খুঁজেও বের করেছেন। মার্গারিটা টরেস আর জোসে অর্তেগা নামের এই দুই গবেষকের মতে, দুই হাজার বছরের পুরনো অতি আরাধ্য সেই পেয়ালাটি বর্তমানে আছে স্পেনের ব্যাসিলিকা অব স্যান ইসিদিরোতে। ‘দ্য কিংস অফ দ্য গ্রেইল’ বইয়ে তারা এই পেয়ালাটিকে উল্লেখ করেছেন আসল গ্রেইল হিসেবে। বিভিন্ন হাত ঘুরে মধ্যযুগের কোনো সময়ে সেখানে পৌঁছেছিল। এই দুজনের গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল মুসলিম শাসনের সময় স্পেনে আসা বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান। গবেষণার এক পর্যায়ে তাদের হাতে দুটি মিশরীয় পার্চমেন্ট এসে পৌঁছায়। সেটা পাঠোদ্ধার করে দেখা যায়, তৎকালীন মুসলিম শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায়  একদল অভিযাত্রী একটি পেয়ালাকে জেরুজালেম থেকে মিশরের কায়রোতে এনেছিল। পরবর্তীতে মিশরের দুর্ভিক্ষের সময় আন্দালুসের আমির সাহায্য করলে তাকে এই গ্রেইল হস্তান্তর করা হয়। তারও পরে শান্তিচুক্তির প্রতীক হিসেবে আন্দালুসিয়ার শাসক রাজা প্রথম ফার্দিন্যান্দের কাছে এই গ্রেইল হস্তান্তর করেন, যা বর্তমানে স্পেনে রয়েছে। পরবর্তীতে স্পেনে মুসলিমদের পতন ঘটলেও পেয়ালাটির স্থান হয় ব্যাসিলিকা অব স্যান ইসিদিরোতে।


কার্বন ডেটিং করে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে স্পেনের গবেষকগণ দাবী করেন যে, এই পানপাত্র তৈরি করা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দ থেকে ১০০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে। এটা ঠিক যে বিস্তারিত গবেষণা ছাড়া এটাকে নিশ্চিতভাবে গ্রেইলের স্বীকৃতি দেয়া যাচ্ছে না। তবে ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একটি সত্যিকারের পেয়ালা ‘হোলি গ্রেইল’ এর মর্যাদা দাবী করেছে।



হদিস: 

১। বার্নাবাসের বাইবেল- আফজাল চৌধুরী অনূদিত 

২। ইন্টারনেট



পোস্ট ভিউঃ 33

আপনার মন্তব্য লিখুন