অন্তত কিছুক্ষণ বিষণ্ণ থাকুন, দীর্ঘতম স্নানের কাছে এবং যে দুপুর বাহানা বানায়

লেখালোক পাঠ প্রতিক্রিয়া
অন্তত কিছুক্ষণ বিষণ্ণ থাকুন, দীর্ঘতম স্নানের কাছে এবং যে দুপুর বাহানা বানায়

তুমি বলেছিলে রাতে তোমার ঘুম হয় না,

আমি বুঝেছিলাম সময় চাইছো;

তুমি বলেছিলে “আকাশে কী মেঘ করেছে দেখো?”

আমি বুঝেছিলাম তোমার মন খারাপ।

তুমি বলেছিলে “চুলে জট বেঁধেছে”;

আমি বুঝেছিলাম তুমি স্পর্শ চাইছো।


ফেসবুকের কোন পাতায় কিংবা কারো টাইমলাইনের স্ট্যাটাসে গতবছরের মাঝামাঝি দীর্ঘ কবিতাটা পড়ার পর থেকেই মাথায় গেঁথে গিয়েছিল, ভাবছিলাম কে সেই ভাগ্যবান যার ভাবনা থেকে এমন অমিয়ধারা ঝরে পড়ে! কবিতার উপরে নিচে কোথাও কবির নাম উল্লেখ ছিল না। অবশেষে কবিকে খুঁজে পেয়েছিলাম, কবি স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী। রকমারিতে সার্চ করে তার দু’টা কাব্যগ্রন্থ পেয়েছিলাম, ‘অন্তত কিছুক্ষণ বিষণ্ণ থাকুন’ এবং ‘দীর্ঘতম স্নানের কাছে’। উপরের কবিতার লাইনগুলো ‘অন্তত কিছুক্ষণ বিষণ্ণ থাকুন’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘একটা তুমির গল্প’। এরপর এবারের বইমেলা থেকে কিনলাম ‘যে দুপুর বাহানা বানায়’, এভাবে একটা কবিতা পাঠের ভালোলাগা আমাকে কবির প্রকাশিত তিনটা কাব্যগ্রন্থই পাঠের অভিজ্ঞতা দেয়। নিচে আমার ভালোলাগা পর্যায়ক্রমে শেয়ার করতে যাচ্ছি।


২  

কাব্যগ্রন্থ: অন্তত কিছুক্ষণ বিষণ্ণ থাকুন 

কবি: স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী 

প্রকাশক: কবিতা 

প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০২২ 

দ্বিতীয় মুদ্রণ: একুশে বইমেলা ২০২২

প্রচ্ছদ: সামিহা তাহ্‌সীন    

মুদ্রিত মূল্য: ২০০ টাকা


২.১  

চারফর্মার বইএ মোট ৫৬টা কবিতা ঠাই পেয়েছে। সহজ সরল ভাষায় অনুভূতির প্রকাশ। কবিতাগুলো হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কবি যেমনটা বলেছেন, ‘নিজে যেভাবে চারপাশটাকে দেখি, অনুভব করি সেইসব সযত্নে ছোঁয়াচে করার চেষ্টা করেছি মাত্র।’ তিনি ছোঁয়াচে করতে পেরেছেন বলেই তাকে নিয়ে লিখছি। তার লেখা কবিতার কয়েকটা লাইন,


ও আমার প্রেমিক, 

বৈশিষ্ট্যহীন, মেরুদণ্ডটাও বাঁকানো, কুঁজো হয়ে হাঁটে, ভয়ে ভয়ে রাস্তা পার 

হয়, বন্ধুদের আড্ডায় আমার ছবি দেখিয়ে বলে না পৃথিবীর সবচাইতে 

সুন্দরী প্রেমিকাটা শুধু তার কাছেই আছে।


ও আমার প্রেমিক, ওর শার্টের দুটো বোতাম ছেড়া, মায়ের ব্লাডসুগার 

বোনের বিয়ে হয়নি।


২.২ 

কবিতাগুলো যেন এক মধ্যবিত্ত প্রেমিকের জীবন গাঁথা, প্রেমিকাও তাই। আটপৌরে জীবনের গল্প, অনুভূতির সহজবোধ্য প্রকাশ। আর তাই প্রতিটা কবিতাই কমবেশি স্পর্শ করে যায়,


ও আমার প্রেমিকা, বয়স তেইশ বছর, বাবা নেই, মামার বাড়িতে মানুষ। 

আমার কোন শার্টে কটা বোতাম ছিঁড়ে গেছে, কটা চাকরি হবে হবে করেও

হয়নি, ও সব জানে।


ও জানে আমি কখন বাড়ি ফিরি, মাসের কোন সময়টাতে আমার পকেটে 

টাকা থাকে না,

আমার মাথাব্যথা কোন ট্যাবলেটে ভালো হয়, আমার কোন বন্ধুটা ভালো, 

কোনটা সুবিধাবাদী, ও সব জানে।


কাব্যগ্রন্থ: দীর্ঘতম স্নানের কাছে  

কবি: স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী 

প্রকাশক: ঘাসফুল 

প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা ২০২৩ 

দ্বিতীয় মুদ্রণ: জুন ২০২৩ 

প্রচ্ছদ: মাইশা তাবাসসুম 

মুদ্রিত মূল্য: ১৬০ টাকা


৩.১ 

তোমার সাথে আর কিছুক্ষণ থাকি?

দু’-চার মিনিট, খুব বেশি না-

আরেকটা কাঠ, একটু আগুন, শীত অসুখের অল্প জ্বরে ইচ্ছে করেই চোখ 

ভেজানো;

যেমন করে আরেকটু রাত ব্যথার কাছে থাকে-

আমি ঘর পালানো পাখির মতো ইতস্থত এদিক সেদিক! কোথায় যাবো-

আর কিছুক্ষণ থাকি?


কখনো কখনো সামান্য চাওয়াগুলোও যেন পূরণ হবার নয়। পূরণ হয়না। উপরের কবিতার লাইনগুলো অনেকক্ষণ নিজের ভাবনার জগৎ আর্দ্র করে রাখে। এরকম আরেকটা কবিতা,


আমাদের সাহস নেই, আমাদের ভালোবাসা প্রকাশ করার;

আমাদের ইচ্ছে নেই, পুরনো ইতিহাস নতুন করে টেনে এনে আবার 

নিজেদের কষ্ট দেয়ার;

আমাদের দায় নেই, সম্পর্কটা ইচ্ছে করেই টেনেটুনে লম্বা করার। 

তবুও

একটা উলে বোনা সোয়েটার আর অনেকগুলো সেকেলে জামদানী একই

আলমারিতে থাকলে, ভালো থাকে!

আমাদের ‘ভালো থাকা’ ছাড়া আর কোন ব্যক্তিগত ইচ্ছে নেই।


৩.২ 

মাত্র তিন ফর্মায় সুন্দর সুন্দর ৪১টা কবিতা ছাপানো হয়েছে। সবগুলো কবিতাই এরকম প্রেম-অপ্রেম-বিরহের কবিতা। এমনকি স্পর্শ করে যায় উৎসর্গ পাতার লেখাটুকুও,


দেখা হয় না, কথা হয় না; তবুও! 

কোথাও না কোথাও তুমি আমার সাথেই থাকো-

স্মৃতিতে, দুঃস্বপ্নে, অসম্ভব যন্ত্রণায়, মন খারাপ করা গানের লাইনে,

মাঝরাত্তিরের বুকের ব্যথায়; তুমি আছো।


এই এলোমেলো বইটা তোমার জন্য,


আমাদের যা কিছু ভালো হওয়ার কথা ছিলো, 

সেসব ভালো তোমার হোক।


এরকম আবেগ ছুঁয়ে যাওয়া উৎসর্গপত্র খুব একটা পড়িনি। স্তবক শেষ করবো কবির আরেকটা লেখা দিয়ে,


ঘুমোতে যাওয়ার আগে-

দুটো সিগারেট এখনো বাঁচিয়ে রাখি

একটা ভোরবেলা চায়ের সাথে, আরেকটা ফেলে দেবো যদি তোমার সাথে 

দেখা হয়।


হবে হয়তো, ঈশ্বর ইয়ার্কি ভালোবাসেন। আমি তোমাকে।


কাব্যগ্রন্থ: যে দুপুর বাহানা বানায়   

কবি: স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী 

প্রকাশক: অক্ষরবৃত্ত 

প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২৪  

প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত  

মুদ্রিত মূল্য: ২০০ টাকা


৪.১ 

কিছু একটা হোক-

চাকরি অথবা বিয়ে 

লম্বা একটা ট্যুর অথবা এগারো ঘন্টার নিবিড় ঘুম;

কিছু একটা হোক, তোমার সাথে আমার-

ঝগড়া অথবা পাখির বাসার মতো ঘর;

চোখ তুলে তাকালেই নাস্তানাবুদ

অথবা

চোখ ফিরিয়ে নিলে ছোটখাটো হার্টঅ্যাটাক।


এরকম দারুণ ৫৫টা কবিতা চার ফর্মায় ছাপানো হয়েছে। প্রতিটা কবিতায় অনুভূতির টুকরোগুলো যেন অমৃতের মতো মিশে আছে। ভালোবাসা মানে তো একটা মানুষকে বোঝার চেষ্টা করতে করতে একটা জীবন পার করে দেয়া, মধুর স্মৃতিগুলোকে বুকপকেটে জমিয়ে রাখা। কবিতায় যেমন,


তোমাকে দেখি না ঠিক, তোমার হাহাকার দেখি-

কীভাবে সন্ধ্যে ছয়টার বাস থামাও, কপালের ঘাম মোছো হালকা

নীল ওড়নায়।

তোমার স্বপ্নগুলো প্রতিদিন হাইওয়ের রোড ধরে কোথায় যায়,

কে জানে!

তোমাকে বুঝি না, তোমার নীরবতা বুঝি-

একটা লম্বা চিঠি লিখে ছিঁড়ে ফেলে দেয়ার পর তোমার শান্ত শুভ্র 

মুখ, কিছুটা সবুজ হয়।


তোমাকে চিনি না ঠিক-

তোমার চলে যাওয়ার রাস্তাটা চিনি।


৪.২ 

কবি বলেছেন, এই মুড সুইং এর পৃথিবীতে এখনো কিছু মানুষ আছে যারা জানে কীভাবে নিজের মানুষটাকে আগলে রাখতে হয়, কীভাবে কোন শর্ত ছাড়াই ভালোবাসতে হয়। কবিতার ভাষায়,


আমি যদি বলি বৃষ্টি নামবে-

তুমি বিশ্বাস করে জানালার কাছে যাও।

একইরকম মিথ্যা দৃশ্যের মতো পৃথিবীতে হাজারটা অদ্ভুত ঘটনা

ঘটে।


নতুন কেনা শাড়ি ধুয়ে দিয়ে কিছুটা রং চলে যাওয়ার পর, যখন

তুমি পরবে; শুধুমাত্র তখনই তোমাকে প্রতিমা বলে ডাকব;

যদিও এইসব অসম্ভব-

তোমার ভালো নাম কুলসুম। আমি তোমার বাসার নিচে রিচার্জ,

ইন্টারনেট আর মিনিটের ব্যবসা করি।


আমাদের সম্পর্ক বাকীর খাতায়। ধারদেনা অবশ্যই সুন্দর।


প্রথম কাব্যগ্রন্থে কবি ছিলেন মানুষের ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো ভূত! দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি কবির জন্ম চট্টগ্রামে, সেখানেই থাকেন। ছোট থেকেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করছেন। 

কাব্যগ্রন্থের দারুণ প্রচ্ছদগুলো কবিতার সাথে যথেষ্ট মানানসই। প্রিন্টের মান ভালো, চমৎকার বাঁধাই। 

আমি কবি’র সাফল্য কামনা করছি।


হ্যাপি রিডিং 

শুভ কামনা নিরন্তর। 

সুমন সুবহান। 




পোস্ট ভিউঃ 4

আপনার মন্তব্য লিখুন