নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস ও এক রাজপুত্রের হাহাকার: তারেক রহমানের জীবন যেন গ্রিক ট্র্যাজেডির জীবন্ত মহাকাব্য

লেখালোক এটাসেটা
নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস ও এক রাজপুত্রের হাহাকার: তারেক রহমানের জীবন যেন গ্রিক ট্র্যাজেডির জীবন্ত মহাকাব্য

১ 

গ্রিক ট্র্যাজেডির মহানায়ক সিসিফাস বা প্রমিথিউসদের গল্প আমরা বইয়ের পাতায় পড়ি। নিয়তির নির্মম পরিহাসে তাদের জীবন কীভাবে ছারখার হয়ে যায়, তা দেখে শিউরে উঠি। কিন্তু আমাদের সমসাময়িক রাজনীতিতে এমন একজন মানুষ আছেন, যার জীবনকাহিনি গ্রিক পুরাণের যে কোনো ট্র্যাজেডিকেও হার মানায়। তিনি তারেক রহমান। এ যেন একজন রাজনৈতিক নেতার খোলসের নিচে জমে থাকা দীর্ঘ বছরের ব্যক্তিগত রক্তক্ষরণ, ইতিহাসের পাতা ছুঁয়ে থাকা অনন্য উপাখ্যান। বাইরে থেকে আমরা হয়তো একজন রাজনৈতিক নেতাকে দেখি, কিন্তু তার অন্তরের গভীরে জমে থাকা রক্তক্ষরণ ক’জন দেখি?


একটি শিশুর শৈশব হওয়ার কথা ছিল রঙিন। কিন্তু তারেক রহমানের শৈশব শুরু হয়েছিল যুদ্ধের দামামা আর মৃত্যুর পরোয়ানা দিয়ে। ১৯৭১ সালে মাত্র ৬ বছর বয়সে মা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে তিনি যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গৃহবন্দী তখন চারদিকে লাশের মিছিল। মৃত্যু ভয় কাকে বলে, তা তিনি চিনেছেন সেই বয়সে যখন অন্য শিশুরা রূপকথার গল্প শোনে। ১৯৭১ সালের ২ জুলাই থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তিনি ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের একটি বাড়িতে অবরুদ্ধ ছিলেন। এরপর ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ১০ বছরের শিশু তারেক রহমান চোখের সামনে দেখেছেন ক্ষমতার পালাবদল এবং বাবার জীবনের ঝুঁকি। সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান যখন মুক্ত হন, তখন প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া।


গ্রিক ট্র্যাজেডিতে দেখা যায়, নায়ক যখন পূর্ণতার দিকে এগোতে থাকেন, ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে পড়ে তার মাথায়। তারেক রহমানের জীবনে সেই অন্ধকার নেমে আসে মাত্র ১৫ বছর বয়সে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তারিখে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তার বাবা শহীদ জিয়াউর রহমান। আর তাই কিশোর বয়সেই তারেক রহমানকে শিখতে হয় পিতৃহীন পৃথিবীতে কীভাবে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়। তারেক রহমানের জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর অধ্যায় শুরু হয় ২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর। ৭ মার্চ ২০০৭ তারিখে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক কুটিল চক্রান্তে তার পুরো পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। রিমান্ডের নামে সেসময় তার ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। এতে তার মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেয়। রাজপুত্র সমতুল্য একজন যুবনেতার এই শারীরিক বিপর্যয় যেন প্রমিথিউসের ওপর ঈগলের ঠুকরে খাওয়ার যন্ত্রণার মতোই তীব্র।


৪ 

নিয়তি তাকে শুধু শারীরিক যন্ত্রণা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, মানসিকভাবে তিলে তিলে নিঃস্ব করেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি পান সবথেকে কঠিন সংবাদটি। ২৪ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে মালয়েশিয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আদরের ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো। যে ভাই ছিল তার শৈশব-কৈশোরের সাথি, রাজনৈতিক ও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি সেই ভাইয়ের লাশটি পর্যন্ত শেষবার দেখতে পাননি। বাবার অবর্তমানে বড় ভাই-ই বাবার ছায়া, কিন্তু সেই ছায়া হয়েও ভাইকে বিদায় জানাতে না পারার হাহাকার কোনো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে তারেক রহমানের জীবনের ট্র্যাজেডির চূড়ান্ত অঙ্ক সম্ভবত সম্প্রতি অভিনীত হলো। দীর্ঘ ১৬ বছর প্রবাসে থেকে তিনি দেখেছেন তার বৃদ্ধ ও অসুস্থ মাকে কীভাবে পরিত্যক্ত কারাগারে এবং পরবর্তী সময়ে নিভৃত অন্তরীণ অবস্থায় বছরের পর বছর পার করতে হয়েছে। জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনার দীর্ঘ একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে। এরপর মা যখন উন্নত চিকিৎসার জন্য এবং ছেলের টানে লন্ডনে গেলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মা-ছেলের সেই পুনর্মিলন স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহ। তিনি দেশে ফেরার এক সপ্তাহের মাথায়, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মমতাময়ী মা বেগম খালেদা জিয়া। বাবা গেলেন, ভাই গেলেন, সবশেষে মা-ও বিদায় নিলেন। এই বিশাল পৃথিবীতে তারেক রহমান যেন এক নিঃসঙ্গ অভিযাত্রী!


৫ 

অ্যারিস্টটল ভাষায় ট্র্যাজেডি হলো মানুষের সেই বেদনা, যা ভয় এবং করুণার উদ্রেক করে। তারেক রহমানের জীবন সেই সংজ্ঞাকেও অতিক্রম করেছে। একজীবনে একজন মানুষ আর কতটুকু হারাতে পারে? রাজনীতি তাকে খ্যাতি দিয়েছে, কিন্তু তার বদলে কেড়ে নিয়েছে প্রিয় মুখগুলো। আজ যখন আমরা তার দিকে তাকাই, তখন কেবল একজন নেতাকে দেখি না; দেখি নিয়তির সাথে লড়াই করা এক অমর যোদ্ধাকে, যার জীবনগাথা ইতিহাসের পাতায় ‘ট্র্যাজেডির মহাকাব্য’ হিসেবেই লেখা থাকবে। এই লেখা শেষ করবো সোফোক্লিসের উক্তি দিয়ে, ‘No man can escape his destiny, but the glory of a hero lies in the struggle against it.



পোস্ট ভিউঃ 23

আপনার মন্তব্য লিখুন