পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়

লেখালোক এটাসেটা
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়

আজ World Teachers' Day, ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ আগস্ট তারিখে বিশ্বব্যাপী এই দিনটা পালন করা হয়। এবছর ১০০ টি দেশে এই দিনটা উদযাপন করা হচ্ছে। সমাজ গঠন এবং ছাত্রদের মেধার বিকাশে শিক্ষকদের ভুমিকা বোঝানোর উদ্দেশ্যকে প্রতিপাদ্য রেখে প্রতি বছর জাতিসংঘের শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (UNESCO) এবং এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল (EI) বিভিন্ন থিম নির্ভর প্রচারণা চালায়, যেমন- ২০১৭ সালে থিম ছিল ‘Empowering Teachers’, ২০১৮ সালে থিম ছিল ‘The Right to Education Means the Right to a Qualified Teacher’, এ বছরের জন্য থিম নির্ধারিত হয়েছে ‘The teachers we need for the education we want


আমি এই মহৎ দিনে আমার একজন প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে চাই।


১৯৭৭ সালে রংপুর সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর অফিসার এবং স্থানীয় জনসাধারণের সন্তানদের লেখাপড়ার সুবিধার্থে ব্রিগেডিয়ার এম এ লতিফ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরের বছর, ১৯৭৮ সালে স্কুল এবং ১৯৮১ সালে কলেজ বিভাগ চালু হয়।


প্রাইমারী শেষে বাবা আমাকে এই স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করে দিলেন। নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ, নতুন সহপাঠীদের সাথে বন্ধুত্ব তৈরি হতে বেশি সময় লাগলো না। আমাদের স্যার-ম্যাডামরা খুবই স্মার্ট ছিলেন এবং তারা এতটাই দারুণভাবে পড়াতেন যে, এতটা বছর পরে এসেও তাদের অনেকের কথা খুব করে মনেপড়ে। সবচেয়ে বেশি মনেপড়ে আমাদের প্রিন্সিপ্যাল মোঃ আনোয়ার হোসাইন স্যারের কথা। স্যার যখন স্কুলের ঝকঝকে প্রশস্ত বারান্দা দিয়ে চকচকে পালিশ করা জুতা পরে হাঁটতেন তখন তাঁর জুতার ঠক ঠক শব্দ অনেকদূর থেকেও শোনা যেত, কারণ তিনি প্রিন্সিপ্যাল চেম্বার থেকে বের হওয়া মাত্রই চারদিকে সুনসান নীরবতা বিরাজ করতো। স্যার ইস্তিরি করা প্যান্টের ভিতরে শার্ট গুঁজে দিয়ে গলায় টাই ঝুলিয়ে বুকের সিনা টানটান করে এমনভাবে হাঁটতেন যে তাঁর দিকে তাকালেই মুখের ভাষা হারিয়ে যেত। তিনি কাউকে বকতেন না, তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্ব দিয়ে সমীহ আদায় করে নিতেন। Morning assembly তে তিনি দৃঢ় এবং স্পষ্টভাবে বাংলা-ইংরেজী মিলিয়ে যে বক্তৃতা দিতেন তা যেন এখনও কানে বাজে। কিছুদিন পরে আমাদের স্কুলের সব ক্লাসে সাউন্ড সিস্টেম লাগানো হলো, তিনি তাঁর অফিস থেকে স্টুডেন্টদের উদ্দেশ্যে দিক নির্দেশনা দিতেন, আমরা ক্লাসে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মত তা শুনতাম। স্যারের চলা-ফেরা, হাঁটার দৃপ্তভঙ্গী এবং স্মার্টনেস দেখে অনেকদিন পর্যন্ত জানতাম তিনি একজন উর্ধতন সামরিক অফিসার। আমার বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সামরিক অফিসার ছিলেন, তাদের মত তাঁরও রাশভারী স্বভাব দেখে তাঁকে ওনাদের মতোই একজন ভেবেছিলাম।


স্যার সামরিক অফিসার না হলেও তারমাঝে সামরিক ছাপ পুরোমাত্রায় ছিল, তিনি পাকিস্তান এয়ারফোর্স পাবলিক স্কুল সারগোদা এবং ঢাকায় নটোরডেম কলেজের ছাত্র ছিলেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অনার্স এবং মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। স্যার বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের খালাতো ভাই ছিলেন। তিনি একজন গ্লাইডার পাইলট, খেলার মাঠে তিনি ছিলেন অনবদ্য, ১৯৬১ সালে ফুটবল কালারস লাভ করেন। স্যার ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক এবং Adjutant ছিলেন, ১৯৬৯/৭০ সালে বেস্ট টিচার হিসেবে পুরস্কৃত হন। তাঁর উদ্যোগে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল কয়েক বছরের মধ্যেই ৩য় থেকে দ্বাদশ শ্রেণীতে উন্নীত হয়। সম্ভবত ১৯৮৫ সালে আমাদেরকে ছেড়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার পদের দ্বায়িত্ব নিয়ে চলে যান এবং সেখান থেকেই ২০০৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অসংখ্য স্টুডেন্ট, সহকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ী রেখে ২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর তারিখে স্যার মৃত্যুবরণ করেন। আজ World Teachers' Dayর দিনটিতে স্যারকে বিশেষভাবে স্মরণ করছি, দু’সপ্তাহ পরে স্যারের মৃত্যুবার্ষিকী। আল্লাহ্‌ ওনার উপরে বেহেশত নসীব করুন।


স্যার আজ নেই, কিন্তু কান পাতলেই যেন একজোড়া জুতার মচমচ শব্দ শুনতে পাওয়া যায়, কে যেন স্কুলের ঝকঝকে প্রশস্ত বারান্দা দিয়ে আজো হেঁটে যায়, আজো কানে বাজে ঠক ঠক ঠক ঠক।



পোস্ট ভিউঃ 22

আপনার মন্তব্য লিখুন