ভাস্কর শামীম শিকদারঃ একে একে নিভিছে দেউটি

লেখালোক এটাসেটা
ভাস্কর শামীম শিকদারঃ একে একে নিভিছে দেউটি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষক ও ভাস্কর শামীম সিকদার গতকাল (মঙ্গলবার, ২১ মার্চ ২০২৩) বিকাল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারাগেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। কবি জাকারিয়া চৌধুরী তার স্বামী ছিলেন। তিনি মৃত্যুকালে  দু’সন্তান রেখে গেছেন। তার মৃত্যুর পর ফেসবুকের সব গ্রুপ/পেজ গতকাল এবং আজ তাকে নিয়ে খবরে সয়লাব। সবখানেই তাকে নিয়ে লেখার সময় সর্বহারা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত সিরাজ সিকদার যে ওনার বড় ভাই সে খবরটিও উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু লেখায় অবশ্য প্রয়াত লেখক আহমদ ছফার সাথে তার প্রেমের সম্পর্কের বিষয়েও বিচ্ছিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেহেতু ষাট-সত্তুরের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্প-সংস্কৃতি-রাজনীতি নিয়ে পড়াশুনার সূত্রে খানিকটা ধারণা আছে তাই দেরিতে হলেও ভাবলাম তাকে নিয়ে আমিও দু’কলম লিখি।


ভাস্কর শামীম শিকদার ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পাশে ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ ভাস্কর্যটি তৈরি করেন। এছাড়া জগন্নাথ হলের সামনে ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে নজরুল, জগন্নাথ হলের মাঠে দাঁড়ানো ‘বিবেকানন্দ’ ভাস্কর্য শামীম শিকদারের কাজ। নিউ ইস্কাটনে তার একটি ভাস্কর্যবাগান আছে। ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি শামীম শিকদার বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন,  যেমন- ‘ইনার ট্রুথ অব স্কাল্পচার: আ বুক অন্য স্কাল্পচার’, ‘স্কাল্পচার কামিং ফরম হ্যাভেন, কনটেম্পোরারি আর্ট সিরিজ অব বাংলাদেশ’।


কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ২০০০ সালে একুশে পদক পান।


শামীম শিকদার জিন্সের শার্ট, পায়ে কেডস পরতেন এবং পকেটে সত্যিকারের রিভলবার ঝুলিয়ে রাখতেন। কেন রাখতেন? তার বড় ভাইয়ের নাম সিরাজ শিকদার, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে শ্রেণিবদলের আলোচিত বিপ্লবী সিরাজ শিকদার। তাহলে বড় ভাইএর মতো তিনিও কি নিজেকে বিপ্লবী মনে করতেন? হয়তোবা তাই কিংবা এমনিই। অবশ্য অ্যান্থনি ম্যাসকার্নহাস এর লেখা ‘বাংলাদেশঃ রক্তের ঋণ’ থেকে জানায় যায় যে, তার ভাই যখন রক্ষীবাহিনীর হাতে নিহত হন তখন তার বয়স ১৯ বছর। তিনি তার ভাতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে সেসময় সর্বহারা পার্টির কাছ থেকে একটা রিভলবার সংগ্রহ করেছিলেন। তবে সে প্রসঙ্গ আজ থাক। ভাস্কর শামীম শিকদারের প্রসঙ্গ এলে অবধারিত ভাবে লেখক আহমদ ছফা এবং তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’র কথাও এসে যায়। সে প্রসঙ্গেই বরং কথা বলি।


অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’ প্রথমে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রাণপূর্ণিমার চান নামে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে মাওলা ব্রাদার্স উপন্যাস হিসেবে এটি ১৯৯৬ সালে প্রকাশ করে। উপন্যাসটা দুই পর্বে শেষ হবার কথা ছিল কিন্তু দ্বিতীয় খণ্ডটি পরবর্তিতে আর প্রকাশিত হয়নি। উপন্যাসটা চিঠি’র মত করে লেখা হয়েছিল, যারা নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব’ উপন্যাস পড়েছেন তারা উপন্যাস লেখার এই ধারার সাথে পরিচিত। উত্তম পুরুষে লেখা উপন্যাসের মূল চরিত্র জাহিদ তার নতুন প্রেমিকা শাবানকে প্রাক্তন অসফল প্রেমের গল্প চিঠিতে লিখে জানিয়েছেন। নতুন প্রিয়তমার কাছে নিজের বিশ্বস্ততা প্রমাণের জন্য অকুণ্ঠচিত্তে অতীতে তার জীবনে আসা তিনজন নারীর কথা তিনি চিঠিতে বর্ণনা করেছেন।


আহমদ ছফা স্বয়ং দাবি করেছেন, ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’ আত্মজৈবনিক উপন্যাস। তার জীবনে উপন্যাসটির বেশিরভাগ চরিত্রের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল বলে তিনি স্বীকার করেছেন।উপন্যাসটা পড়লে  চরিত্রগুলোর সাথে বাস্তব জীবনের মানুষগুলোর মিল আসলেই খুঁজে পাওয়া যায়। বাস্তবের লেখক আহমদ ছফা হলেন উপন্যাসের জাহিদ, এভাবে এগোলে যেটা দেখা যায়, জাহিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন  রিসার্চ স্কলার। চাকচিক্যবিহীন জীবনে একসময় জনৈক দুরদানা আফরাসিয়াবের সাথে তার পরিচয় ঘটে। গতানুগতিক নারীত্বকে অস্বীকার করে আসা দুরদানার ‘অ-নারীসুলভ’ আচরণ সমাজের চোখে দৃষ্টিকটু দেখালেও জাহিদকে তা আকৃষ্ট করে। দুরদানার ভাই বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় জাহিদের অনেক সুহৃদ তাকে সাবধান করে দেয়। দুরদানার পুরুষতান্ত্রিকতাকে পরিহাস করা ব্যক্তিত্ব, যা জাহিদকে একসময় আকর্ষণ করেছিল, ধীরে ধীরে তা যেন মলিন হয়ে যায় এবং এরফলে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। উপন্যাসের এই দুরদানা আর কেউ নন, ভাস্কর শামীম শিকদার।


দুরদানার পর জাহিদের জীবনে আসেন শামারোখ, জাহিদ যাকে কন্যা শামারোখ বলে বিবেচিত করেছেন। শামারোখই একসময় জাহিদের ধ্যানজ্ঞান হয়ে ওঠেন, তার জন্য এমনকি তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার কথাও নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার চোখে শত্রুতে পরিণত হয়ে শামারোখকে চাকরি পাইয়ে দেন। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে শামারোখের মাঝেও পরিবর্তন ঘটে এবং এক কবির সাথে তিনি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এরফলে জাহিদের সাথে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়। শামারোখ ওরফে সুরাইয়া খানম সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। আহমদ ছফার সাথে তার সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর সুরাইয়া খানম কবি আবুল হাসান এর প্রেমে পড়েন।


তৃতীয়জন হলেন সোহিনী। জাহিদের জীবনে দুরদানা ও কন্যা শামারোখ এর অধ্যায় শেষ হলেই আসে সোহিনী। সোহিনী’র কাছেই জাহিদ শেষ আশ্রয় চায়। কিন্তু সোহিনী সম্পর্কে উপন্যাসে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। হয়তো দ্বিতীয় খন্ডে লেখক সব স্পষ্ট করতেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, লেখক দ্বিতীয় খন্ড শেষ করতে পারেননি। এই উপন্যাস নিয়ে আমার এই অতৃপ্তির কথা একবার কথা প্রসঙ্গে মাওলা ব্রাদার্সের কর্ণধার মাহমুদ ভাইয়ের কাছে বলেছিলাম।


৩ 

কোনো ভাস্কর বা শিল্পীর কাজ সবার কাছে একরকমভাবে ভালোলাগার কথা না। এটাই স্বাভাবিক। মূর্তি  এবং ভাস্কর্যের মাঝে পার্থক্য সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা রেখেই বলছি, আমি শামীম শিকদার এবং মৃণাল হকের ভাস্কর্য কখনই পছন্দ করিনি। তবে আজ সেই ষাটের দশক নেই, সত্তরের দশক নেই কিন্তু ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বিদ্যমান আপন মহিমায়। আজ সেই আহমদ ছফা নেই, আবুল হাসান নেই, সুরাইয়া খানম নেই কিন্তু তাদের গল্পগুলো আজো থেকে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে-ঘাটে-চত্ত্বরে। এই গল্পের সর্বশেষ চরিত্র ভাস্কর শামীম শিকদার ২১ মার্চ তারিখ থেকে আর নেই, তিনিও চলে গেলেন অনন্ত  পদাযাত্রায়। তবে পাঠকের-ভক্তের গল্পে-আলোচনায় থেকে গেলেন তিনি, তিনি নেই তবে তাকে নিয়ে আজ আলোচনায় মুখর ফেসবুকের পাতা। লেখা শেষ করবো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কবিতা দিয়ে,


রঙ্গমঞ্চে একে একে নিবে গেল যবে দীপশিখা

রিক্ত হোলো সভাতল, আঁধারের মসী-অবলেপে

স্বপ্নচ্ছবি-মুছেযাওয়া সুষুপ্তির মতো শান্ত হোলো

চিত্ত মোর নিঃশব্দের তর্জনী সংকেতে। এতকাল

যে সাজে রচিয়াছিনু আপনার নাট্য পরিচয়

প্রথম উঠিতে যবনিকা, সেই সাজ মুহূর্তেই

হোলো নিরর্থক। চিহ্নিত করিয়াছিনু আপনারে

নানা চিহ্নে, নানা বর্ণ প্রসাধনে সহস্রের কাছে,

মুছিল তা, আপনাতে আপনার নিগূঢ় পূর্ণতা

আমারে করিল স্তব্ধ, সূর্যাস্তের অন্তিম সৎকারে

দিনান্তের শূন্যতায় ধরার বিচিত্র চিত্রলেখা

যখন প্রচ্ছন্ন হয়, বাধামুক্ত আকাশ যেমন

নির্বাক বিস্ময়ে স্তব্ধ তারাদীপ্ত আত্মপরিচয়ে।     

(প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ) 



পোস্ট ভিউঃ 24

আপনার মন্তব্য লিখুন