মাইকেল কুমির ঠাকুর এবং লিপা ভাবী

লেখালোক এটাসেটা
মাইকেল কুমির ঠাকুর এবং লিপা ভাবী

১   

২০০৮ সালের কথা। 

চাকুরি সূত্রে আমি তখন যশোর সেনানিবাসে।


নভেম্বরের শেষের দিকে গাইড ট্যুরস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনায় সুন্দরবন ভ্রমণের একটা অফার দেখে তাতে নাম দিলাম। সম্ভবত ৪দিন ০৩ রাতের প্যাকেজ ট্যুর ছিল সেটা। তাদের নিজস্ব ট্যুরিস্ট লঞ্চে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। সুন্দর পরিচ্ছন্ন কেবিন, ঝকঝকে বাথরুম। স্ত্রী এবং সন্তানসহ নির্ধারিত দিনে যশোর থেকে ট্রেনে করে খুলনা রেলস্টেশনে পৌঁছতেই তাদের প্রতিনিধি যোগাযোগ করে লঞ্চে নিয়ে গেলেন।


কেবিনে ব্যাগেজ রেখে সকালের বুফে নাস্তায় সহযাত্রীদের সাথে দেখা হলো, কফিপানের ফাঁকে সবার সাথে পরিচিত হলাম। মুশতাক ভাই এবং লিপা ভাবীর সাথে পরিচয় ওভাবেই। কথায় কথায় যখন জানলাম মুশতাক ভাই হাতিবেড়, ভালুকার সেই বাণিজ্যিক কুমির প্রজনন খামারের মালিক তখন তার সাথে ঘনিষ্ঠতা আরও যেন গাঢ় হলো। এমনিতেই উনি যথেষ্ট হাসি-খুশী এবং আড্ডাবাজ মানুষ। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে দারুণসব কথা বলতেন। আর ভাবী বেশ নরম স্বভাবের, মৃদুস্বরে কথা বলেন।


মুশতাক ভাইকে বলেছিলাম, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে শীতকালীন মহড়ার সময় সাভার সেনানিবাস থেকে সখিপুরের সাগড়দীঘিতে গিয়েছিলাম। আমার কোম্পানি ডিফেন্স লাইন থেকে ওনার খামার কাছেই ছিল, গিয়েছিলাম কিন্তু ওনার সাথে তখন দেখা হয়নি। সে অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম। মুশতাক ভাই ২০০৪ সালে বাংলাদেশ রেপটাইল ফার্মস লিমিটেড নামে দেশের প্রথম মিঠা পানিতে (দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় প্রথম) কুমির চাষ শুরু করেছিলেন। ২০১০ সালের দিকে কথাপ্রসঙ্গে জেনেছিলাম তিনি নতুন পণ্য রপ্তানির জটিলতা উৎরে সম্ভবত জার্মানিতে রপ্তানি শুরু করেছিলেন। সেবছরই আমি ইউএন মিশনে কঙ্গোতে চলে গেলে তারপর থেকে আর যোগাযোগ হয়নি। মিশন শেষে দেশে ফিরে আমি নিজেও যেমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, উনিও তাই। পরে শুনেছিলাম ২০১৩ সালের দিকে পিকে হালদারের নজর পড়েছিল তার ওই খামারে। মুশতাক ভাই একপর্যায়ে ফার্মের সব শেয়ার পিকে হালদারের কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।


সুন্দরবন ট্যুরে আমাদের সাথে এক বিদেশী দম্পতি ছাড়াও একজন আর্টিস্ট ছিলেন, ভাইয়ের নামটা স্মরণ নেই। তিনি সারাদিন লঞ্চের ছাদে বসে জলরঙে দারুন সব ছবি আঁকতেন। কথাপ্রসঙ্গে লিপা ভাবি জানতে পেড়েছিলেন আমি আমার স্ত্রীর জন্মদিন একটু অন্যভাবে সেলিব্রেট করতেই সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়েছিলাম। আমরা তখন সম্ভবত কটকা’র দিকে। সারাদিন ট্র্যাকিং শেষে বিকেলে লঞ্চে ফেরার পর, ডিনারের পরপর লিপা ভাবী এবং তার বান্ধবী সুন্দরবনের জমাট নিস্তব্ধতার মাঝে আমার স্ত্রীর জন্মদিনের আয়োজন করে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। ঐ কয়েকটা দিন আমার জীবনের আনন্দদায়ক এক অধ্যায় ছিল।


ট্যুর থেকে ফেরার পরও আমাদের যোগাযোগ ছিল, র‍্যাবে থাকাবস্থায় ভাই একবার কীএকটা কাজে যোগাযোগ করেছিলেন। এরপর ভাইয়ের সাথে আর যোগাযোগ হয়নি।


২০২০ সালের একদিন, পত্রিকার পাতা কিংবা সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে মুশতাক ভাইয়ের গ্রেপ্তারের খবরটা পড়ে আমি হতবাক। আমি শুনেছিলাম প্রিয় মুশতাক ভাই ‘মাইকেল কুমির ঠাকুর’ নামে লিখেন, কিন্তু বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে তার সাথে যোগাযোগ করা হয়নি। আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে পরের বছর, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে ভাইয়ের মৃত্যুবরণ করার খবরটা একদম নিশ্চুপ করে দিল। এই মানুষটার সাথে আর কখনো যোগাযোগ করা হবে না ভাবতেই কেমন লাগলো। আমরা কত কাজ পরে করবো ভেবে ফেলে রাখি, পরে সেটা আর করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই যেমন মুশতাক ভাইয়ের সাথে শতচেষ্টাতেও আর দেখা করা সম্ভব না। একটা মানুষের হাসিমাখা মুখ আর লিপা ভাবীর আন্তরিক ব্যবহার সারাজীবনের জন্য চোখের সাথে এভাবেই ফসিল হয়ে লেগে রইলো। একটা কবিতা লিখেছিলাম সেদিনের অনুভূতি নিয়ে, ২০২৪ সালের বইমেলায় সেটা প্রকাশিত হয়েছে।


৩ 

জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিস সারাফাতকে নিয়ে কার্টুন আঁকার অভিযোগে ২ মে ২০২০ তারিখ থেকে প্রায় এক বছর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মারপ্যাঁচে কারাগারে অন্তরিন ছিলেন। মুশতাক ভাইয়ের মৃত্যুর পর সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেখালেখি এবং  বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপে হাইকোর্টের বিচারকদের একটি প্যানেল ৩ মার্চ ২০২১ তারিখে তাকে জামিন দিলে দু’দিন পর তিনি জেল থেকে বের হয়ে আসেন। এরপর কারাভ্যন্তরে নির্যাতনজনিত কারণে শারীরিক ও মানসিক সংকটে পড়ে তিনি কার্টুন আঁকা বাদ দেন। উনি সম্ভবত এখন বিদেশে থাকেন এবং মানুষ কিশোর নামে পরিচিত। আমি ভাইয়ের আঁকা কার্টুনের ভক্ত, সময় পেলে ফলো করি।


২০২০ সালের মে মাসে গ্রেপ্তারের আগে মুশতাক ভাই ফেসবুকে আহমেদ কবির কিশোরের আঁকা কার্টুন শেয়ার করেন এবং সরকারের কোভিড-১৯ মহামারী অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে লিখেন, “যখন একটি সমাজ মানুষের জীবনহানির চেয়ে অর্থনীতির ক্ষতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে, তখন তার ভাইরাসের প্রয়োজন হয় না, এটি ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ে।


সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিস সারাফাত ফার্মার্স ব্যাংক গিলে খেলে আহমেদ কবির কিশোর কার্টুনটা এঁকেছিলেন, আর তার বন্ধু মুশতাক আহমেদ কার্টুনটা একটা ক্যাপশন দিয়ে নিজের ফেসবুকে শেয়ার করেছিলেন। ঘটনা অতিসামান্য, এতোটুকুই। একারণে মুশতাক আহমেদসহ আরও ১০ জনকে ‘ফেসবুকে করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো’, ‘জাতির জনকের প্রতিকৃতি’, ‘জাতীয় সংগীত’, ‘জাতীয় পতাকা’ ইত্যাদি নিয়ে অবমাননার বিচিত্রসব অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। শাহবাগ থানা’র পুলিশ তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ব্যাংক খেকো চৌধুরী নাফিস সারাফাতের সামনেই নির্যাতন করে বলে শোনা যায়। তাদেরকে প্রায় এক বছর বিনা বিচারে আটকে রাখা হয় এবং ২১ বার তার জামিন আবেদন প্রত্যাখান করা হয়।


মাইকেল কুমির ঠাকুর ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে কারাগারে রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকাবস্থায় নিরাপদে মৃত্যুবরণ করেন। এই বর্বরোচিত হত্যার প্রতিবাদে শাহবাগের শান্তিপূর্ণ শোক মিছিলটাও হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার পন্ড করে দেয়। মুশতাক আহমেদ জানতেন কুমির হিংস্র প্রাণী, কিন্তু শেখ হাসিনা যে তারচেয়েও অধিক হিংস্র, সেটাই তিনি মৃত্যুর আগে জেনে গেছেন।


মুশতাক ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে লেখা ‘লোরকার অপেক্ষায়’ শিরোনামে কবিতাটা ২০২৪ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘তোমার নামে নৌকা ভাসাই’ এর উত্তরকাণ্ড’ অধ্যায়ে ছাপা হয়েছে।


ধুরো মিয়া আপনি কিরকম মানুষ! 

পাঁচদিন থাইক্যা ঘরের বাইরে আসেননা!’ 

প্রথমবার রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাবার সময়- 

সাদা পোষাকের লোকগুলো ঠিক এ কথাগুলোই বলেছিলো। 

দ্বিতীয়বার যখন তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়- 

তার পড়নে ছিলো নীল জিন্স আর হাফ হাতা শার্ট।

‘চিন্তার কিছু নেই-  

কিছুক্ষণ পরেই চলে আসবেন’, তারা বলেছিলো।   

লিপা জানলার পর্দা সরিয়ে তাকিয়েছিলেন- 

সাদা মাইক্রোবাসটার দিকে,   

রাস্তার মাথায় ডানের বাঁকটার খাঁখাঁ শূণ্যতা পর্যন্ত। 

ঐই শেষ দেখা- 

তারা! নাকি রাষ্ট্র! তারা কেউই আসলে কথা রাখেনি!   

কেননা লোকটা ফেরত এসেছিলেন ২৭৭ দিন পর,    

কয়েদী নাম্বার ৯২৭/২০২০ অন্য পরিচয়ে এসেছিলেন   

সাদা কাফনের আড়ালে লাশ হয়ে।  

নির্বাক হওয়ার আগে লিপা বলেছিলেন,’এটা কি হলো!’

প্রতিদিন এভাবে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় লাশের সারি 

নিখোঁজের বিষন্ন মিছিল!  

আসলেই এটা কি হলো! কোন সভ্য রাষ্ট্রে এটা কিভাবে হয়! 

আমাদের চোখ অপেক্ষায় থাকে পরবর্তী লোকটার! 

আমরা অপেক্ষায় থাকি আরেকজন লোরকার।

এমনকি এই যে আমি এখন যে লিখছি!  

আমিও লোরকা হয়ে যেতে পারি মাইরি!   

হতে পারি দেয়ালে সাঁটানো পোস্টার কিংবা 

কারো প্রতিবাদের প্রোফাইল পিকচার, 

আমি নতুন কোন ফ্রাংকোর হাতে নিখোঁজ হতে পারি-  

কোন এক উনিশে আগস্টে।  

আমার নিখোঁজ সংবাদে হয়তো ছেয়ে যাবে ফেসবুক- 

মাঝরাতের টক শো শেষে পকেটের টুংটাং খুচরো,  

প্রতিবাদের মিছিল, সংঘাত কিংবা বিক্ষোভে ফেটে পড়া, 

মানবিক পুলিশের লাঠিচার্জ এবং নতুন কিছু মামলা। 

অমানিশার নিঃসীম আঁধারে তলিয়ে যাওয়া  

জম্বি নাগরিক তখন হয়তো নতুন কোন ইস্যুর অপেক্ষায়,  

বিস্মৃতির আধারে খেই হারিয়ে আমরা হয়তো তখন-  

               আরেকজন লোরকার অপেক্ষায় থাকি।



পোস্ট ভিউঃ 23

আপনার মন্তব্য লিখুন