১
কিছুদিন আগে ঢাকায় নুসরাত ফতেহ আলি খানের কনসার্ট হয়ে গেল। এবং তারপর সোশ্যাল মিডিয়াতে একটা ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে। আমি সেই ফুটেজ না, কাওয়ালি নিয়েই কথা বলবো। কাওয়ালি হল সুফি গানের সবচেয়ে পরিচিত রূপ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের গানের একটা ধারা যা ৭০০ বছরেরও বেশি পুরনো। হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া একাদশ শতাব্দীতে দিল্লিতে তার সমাবেশে এরকম গান ব্যবহার করেছিলেন। তবে তখন গানের সাথে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ছিল না। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার ভক্ত আবুল হাসান ইয়ামিন উদ-দিন খসরু বা আমির খুসরো ১৩ শতকে তুরস্ক, পারস্য, আরব এবং ভারত জুড়ে সঙ্গীত উপাদান এবং গানের সুর মিশ্রিত করে ‘কাওয়ালি’ নামে গানের এই নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন বলে তাকে ‘কাওয়ালির জনক’বলা হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে ভারত, পাকিস্তানে মহান সুফি সাধকদের মাজারে ‘কাওয়ালি’ পরিবেশিত হয়, কারণ এই মাজারগুলোকে মহান আধ্যাত্মিক শক্তির স্থান বলে মনে করা হয়। মাজারকেন্দ্রিক সুফিগান ইরাক, ইরান থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের কিছু এলাকা, পাকিস্তানের সিন্ধু উপত্যকা-বেলুচিস্থান-পাঞ্জাব হয়ে ভারত এবং বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশে লালন, মাইজভাণ্ডারী, হাসনরাজা ইত্যাদি গানে সুফিইজিমের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই গানগুলো কখনো মূল গান ও সুরকে অবিকৃত রেখে আবার কখনো কিছুকিছু শব্দ বা লাইন পালটে, আবার কখনো মূল গানের কিছু লাইন নিয়ে নতুন করে গান রচিত ও সুরারোপ করা হলেও সুফিইজিমের মূল ভাব অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। এসব গানে রূপকের প্রচুর ব্যবহার থাকায় তা বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। কখনো এ যেন মানব-মানবীর চিরায়ত প্রেম ও বিচ্ছেদ, কখনো গুরুশিষ্য আবার কখনো সৃষ্টিকর্তা ও বান্দার মাঝে প্রেম। আমি কিছুদিন পূর্বে আমির খসরু’র লেখা বিখ্যাত কাওয়ালি ‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’ নিয়ে লিখেছিলাম। আমির খসরু কাওয়ালি গানটা সূফী সাধক সৈয়দ উসমান মারওয়ান্দি’র সম্মানে লিখেছিলেন।
রুমি, হাফিজ, বুল্লেহ শাহ, আমীর খুসরো, খাজা গোলাম ফরিদের মতো সুফি কবিদের রচনা দ্বারা যুগেযুগে ‘কাওয়ালি’ অনুপ্রাণিত। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও সুফি গান লিখেছেন। তিনি ১৯১৭ সালের শেষদিকে আর্মিতে যোগ দিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান এবং প্রশিক্ষণ শেষে করাচিতে ছিলেন। সেখানে সহ-সৈনিকদের সাথে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সাথে সঙ্গীত চর্চা করার সুযোগ হয়েছিল। এছাড়াও ওস্তাদজির কাছে ফার্সি ভাষা শেখেন এবং ফারসি ভাষায় দিওয়ান, মসনভি, গজল, রুবাইয়াৎ, খমসা প্রভৃতির সংস্পর্শে আসেন। সুফি প্রেমের গানগুলি প্রায়শই গজল এবং কাফি হিসাবে পরিবেশন করা হয় কাফি এক প্রকারের শাস্ত্রীয় সুফী সঙ্গীত, এর বেশিরভাগই মধ্যে পাঞ্জাবি এবং সিন্ধি ভাষা এবং পাঞ্জাব ভাষা এবং দক্ষিণ এশিয়ার সিন্ধু অঞ্চল থেকে উদ্ভব। কয়েকজন সুপরিচিত কাফি কবি হলেন বাবা ফরিদ, বুল্লেহ শাহ, শাহ হুসেন, শাহ আবদুল লতিফ ভট্টাই, সচল সরমস্ত এবং খাজা গোলাম ফরিদ।
২
উর্দু কবি এবং গীতিকার হানিফ মুহম্মদ ভারতের উত্তর প্রদেশের বুলন্দ শাহারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ‘ফানা’ নামে লিখতেন, এবং ফানা বুলন্দ শেহরি নামে পরিচিত। তিনি সম্ভবত বেলুচিস্তানের মূল গানটা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘মেরে রাশক-ই-কামার’ গজল বা কাওয়ালিটা লিখেন, যাতে নুসরাত ফতেহ আলী খান সুর করেছিলেন এবং ১৯৮৮ সালে শ্রোতারা প্রথম এই গানের সাথে পরিচিত হন। এরপর তার ভাগ্নে রাহাত ফতেহ আলি খান এটি বহুবার কনসার্টে গেয়েছেন। ২০১৭ সালে মিলান অর্জুন লুথরিয়ার নির্মিত হিন্দি সিনেমা ‘বাদশাহো’ তে ব্যবহৃত গানের রূপটা মনোজ মুনতাশিরের দেয়া। তিনি গজলের মাতলা বা প্রথম শের বাদে সম্পূর্ণ নতুন গান লিখেছেন এবং গজলটিকে একটি গানে রূপান্তরিত করেছেন। মূল গজলটা অনেক বড়, সিনেমায় ব্যবহৃত গান নুসরাত ফতেহ আলি খান, তানিস্ক বাগচী দ্বারা পুনঃনির্মিত।
‘মেরে রাশক-ই কামার’ গানটা প্রিয়জনের সাথে মুখোমুখি হওয়ার অপ্রতিরোধ্য অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা। যেখানে চাঁদ, বজ্রপাত, আগুন এবং মদের গবলেট ইত্যাদি রূপকের ব্যবহার রয়েছে। উর্দু কবিতায়, প্রিয়জনের সাথে সাক্ষাত প্রায়শই বক্তার আকাঙ্ক্ষা জাতীয় হয় যার পরিণতি চরম বিচ্ছেদ। এই গানে প্রেয়সী একজন মদের পেয়ালা বহনকারী বা সাকি, যে তার সৌন্দর্যে বক্তাকে মাতাল করে তোলে। গানে ‘rashke qamar’ মানে ‘চাঁদের ঈর্ষা’, অর্থাৎ তুমি দেখতে এতোটাই সুন্দর যে ‘চাঁদ’ও তোমাকে ঈর্ষা করে।
মনোজ মুনতাশিরের লেখা ‘ranjha ho gaye hum fanaa ho gaye’ গানের লাইনে ‘হাম ফানা হো’ লিখে মূল গীতিকার ফানা বুলন্দ শেহরি’র প্রতি যেমন শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। তেমনি এর আরেক অর্থ আছে, লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ কিংবা জুলিয়েট-রোমিও, এদের মতো আরেক জনপ্রিয় জুটি হীর-রাঞ্জা। পাঞ্জাবের চারটি জনপ্রিয় ট্র্যাজিক রোম্যান্সের একটি হীর-রাঞ্জা। বাকি তিনটা হলো মির্জা সাহেবান, সোহনি মাহিওয়াল এবং সসি পুন্নুন। সেক্ষেত্রে গানের এই লাইনের অর্থ দাঁড়ায় আমি তোমার প্রেমের রাঞ্জা’র মতো বিলীন হয়ে গেছি। মনোজ মুনতাশিরের লেখা গানে সুর করেছেন নুসরাত ফতেহ আলী খান। পরবর্তীতে গানটি পাকিস্তান এবং ভারতে জনপ্রিয়তা পেলে জুনায়েদ আসগর, ফাদিয়া শাবরোজ, নসিবো লাল, মাইসাহ, হাসিব মুবাশ্বির, ফাদিয়া শাবরোজ, সোনু কক্কর, রোজালিন সাহু, বাবা সেহগাল ইত্যাদি শিল্পীরাও গেয়েছেন।
নুসরাত ফতেহ আলী খানের কাওয়ালি বা মিলান অর্জুন লুথরিয়ার হিন্দি সিনেমা ‘বাদশাহো’ তে ব্যবহৃত গানটা অনেকেই শুনেছেন তাই আমি বেলুচিস্তানের মূল গানটা আপলোড করলাম। ব্যবহৃত ছবিটা হীর-রাঞ্জা উপাখ্যানের ইলাস্ট্রেশন।
৩
গানের অর্থ এরকমঃ
aise lehra ke tu rubaroo aa gayi
dhaRkanein betahasha taRapne lagin
teer aisa laga dard aisa jagaa
chot dil pe wo khaayi mazaa aa gayaa!
তুমি এমনভাবে হাওয়ার মতো করে আমার কাছে চলে এসেছো যে
বুক চড়মভাবে ধরফর করে চলেছে
তীর এমনভাবে লেগেছে আর ব্যথা এতটা পেয়েছি যে
হৃদয়ে আঘাত পেয়েছি তবুও মজা পেয়েছি
mere rashke qamar tune pehli nazar
jab nazar se milaayi maza aagaya
josh hi josh mein meri aagosh mein
aake tu jo samaayi mazaa aa gaya
হে আমার চাঁদের-ঈর্ষা তুমি প্রথমবার যখন নজরে এলে
যখন নজর মিলিয়েছি তখন মজা পেয়েছি।
জোশে পড়ে প্রচন্ড আগ্রহভরে আমার দিকে
এসে যখন জড়িয়ে ধরলে আমার ভালো লেগেছে ।
mere rashke qamar tune pehli nazar
jab nazar se milaayi maza aagaya
ret hi ret thi mere dil mein bhari
pyaas hi pyaas thi zindagi ye meri
হে আমার চাঁদের-ঈর্ষা তুমি প্রথমবার যখন নজরে এলে
যখন নজর মিলিয়েছি তখন মজা পেয়েছি।
শুধুই ধুলো, ধুলোময় ছিল আমার হৃদয়
তৃষ্ণা, তৃষ্ণার্ত ছিল আমার জীবন
aaj sehraaon mein ishq ke gaaon mein
baarishein ghir ke aayin mazaa aa gaya
mere rashke qamar tune pehli nazar
jab nazar se milaayi mazaa aagaya
আজ মরুভূমিতে আমার হৃদয়ের গ্রামে
বৃষ্টির ধারা নেমেছে, আমি মজা পেয়েছি,
হে আমার চাঁদের-ঈর্ষা তুমি প্রথমবার যখন নজরে এলে
যখন নজর মিলিয়েছি তখন মজা পেয়েছি।
ranjha ho gaye hum fanaa ho gaye
aise tu muskuraayi mazaa aa gaya
barq si gir gayi kaam hi kar gayi
aag aisi lagaai mazaa aa gaya
আমি তোমার প্রেমের রাঞ্জা’র মতো বিলীন হয়ে গেছি
তুমি এমনভাবে হেসেছো যে আমার মজা লেগেছে
আমার শরীরে বিদ্যুৎ পড়ে ঠিকঠাক কাজও করেছে,
এমন আগুন লাগিয়েছো যে মজা পেয়েছি
তথ্যসূত্রঃ এখানে সেখানে
পোস্ট ভিউঃ 23