১
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটারের রায়ে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের আগামীর পথ। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই নির্বাচনে প্রায় ১০ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীকে লক্ষ্য করে যেমন ‘আলবটর’-এর মতো ডিজিটাল বাহিনী ডিপ ফেক কন্টেন্ট দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বা প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করছে, তেমনি বিপরীতে মাহবুব সুমনের ‘বন কাগজ’ লিফলেটের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার নতুন বার্তা দিচ্ছে বড় দলগুলো। ডিজিটাল মাধ্যমের অদৃশ্য থাবার পাশাপাশি নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে থানা থেকে লুণ্ঠিত ১,৩৩৫টি মারণাস্ত্র এবং প্রায় ২,৫৬,০০০ রাউন্ড তাজা বুলেট, যা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই প্রথম নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট এবং ‘না ভোট’ অপশন চালু হওয়ার পাশাপাশি ৫৬ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে এআই-জেনারেটেড অপতথ্য এক বড় ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে বান্দরবানের ১০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় ৮০ হাজার ইশতেহার মুদ্রণ অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। তবে ভোটের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে সাইলেন্ট পিরিয়ডে প্রযুক্তির সূক্ষ্ম কারসাজি এবং অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি সাধারণ ভোটারের মনে চরম বিভ্রান্তি ও আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
২
নির্বাচনী সমীকরণে ‘আলবটর’ ও ডিজিটাল অপশক্তির অদৃশ্য থাবা।
২০২৬-এর নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণে ‘আলবটর’ নামক একটি গুপ্ত ডিজিটাল বাহিনী পর্দার আড়ালে এক শক্তিশালী ও বিপজ্জনক ভূমিকা পালন করছে। এআই ব্যবহার করে তারা ‘ডিপ ফেক’, ‘চিপ ফেক’, বিতর্কিত, সত্যের সাথে মিথ্যে মিশিয়ে বিভ্রান্তিমূলক কন্টেন্ট তৈরি করছে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারী প্রায় ১০ কোটি ভোটারের বড় অংশ এখন তথ্যের জন্য প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় এসব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ভোটের ঠিক আগে একটি সাজানো ভুয়া ভিডিও বা অপতথ্য মুহূর্তের মধ্যে সাধারণ ভোটারের মনে চরম বিভ্রান্তি ও আস্থার সংকট তৈরি করতে সক্ষম। এসব ডিজিটাল কারসাজির ফলে সঠিক ও মিথ্যার পার্থক্য করা সাধারণ মানুষের জন্য অনেকসময় প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। প্রযুক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ভোটারদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এসব ডিজিটাল অপশক্তি।
৩
নিরাপত্তার পথে কাঁটা: লুণ্ঠিত অস্ত্রের ঝনঝনানি ও নির্বাচনী উদ্বেগ।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থিতিশীল সময়ে থানা থেকে লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ২০২৬-এর নির্বাচনে জননিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী লুণ্ঠিত ৫,৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৮৫ শতাংশ উদ্ধার হলেও এখনও ১,৩৩৫টি নিখোঁজ রয়েছে, যা অপরাধীদের হাতে থাকার আশঙ্কা প্রবল। গোলাবারুদের চিত্র আরও ভয়াবহ; লুট হওয়া ৬,৫১,৬০৯ রাউন্ড গুলির মধ্যে প্রায় ২,৫৬,০০০-এর বেশি তাজা বুলেট এখনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। এর পাশাপাশি টিয়ারগ্যাস গান ও গ্রেনেডের মতো সংবেদনশীল সরঞ্জামের ২০ শতাংশ উদ্ধার না হওয়া ভোটার ও প্রশাসন- উভয় পক্ষকেই চরম উদ্বেগের মধ্যে রেখেছে। লুণ্ঠিত অস্ত্রের এই ১৫ শতাংশ এবং গুলির ৩০ শতাংশ উদ্ধার না হওয়া নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পথে এক বড় বাধা। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ বজায় রাখা এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, নির্বাচনের দিন এবং এর আগে-পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১,৫০,০০০ পুলিশ, ১,০০,০০০ সেনাসদস্য এবং প্রায় ৫,৬০,০০০ আনসার সদস্যসহ মোট প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এবারই প্রথম বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি অন্তত ৪১৮টি ড্রোনের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে আকাশপথে নজরদারি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
৪
নির্বাচনী প্রচারে উদ্ভাবন: ‘বন কাগজ’ ও সবুজ বিপ্লব।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম প্রথাগত স্লোগান ও পোস্টারের গণ্ডি পেরিয়ে উদ্ভাবনী ও পরিবেশবান্ধব প্রচারণার সূচনা হয়েছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে ‘বন কাগজ’। অস্থিতিশীলতা আর আশঙ্কার মাঝেও ২০২৬-এর নির্বাচনে পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন হিসেবে আশার আলো দেখাচ্ছে প্রকৌশলী মাহবুব সুমন ও তার প্রতিষ্ঠান ‘শালবৃক্ষ’ -এর উদ্ভাবিত ‘বন কাগজ’। এটি মূলত পরিত্যক্ত ও পুনর্ব্যবহৃত কাগজ থেকে তৈরি একটি বিশেষ মাধ্যম, যার পরতে পরতে সুকৌশলে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে ১১ ধরনের সবজি ও ফুলের বীজ। ভোটাররা যখন প্রার্থীর লিফলেটটি পড়ার পর মাটিতে ফেলে দেবেন বা এটি বৃষ্টির সংস্পর্শে আসবে, তখন পরবর্তী ৮-১০ দিনের মধ্যে সেই পরিত্যক্ত কাগজ থেকেই প্রাণের স্পন্দন হিসেবে অঙ্কুরোদগম ঘটবে। যদিও প্রতিটি লিফলেট তৈরিতে প্রথাগত কাগজের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি (১২০-১৪০ টাকা) খরচ হচ্ছে, তবুও এটি প্লাস্টিক ও কাগজের বর্জ্য কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় বিপ্লব ঘটাচ্ছে। এই কাগজের বিশেষত্ব হলো এর স্থায়িত্ব; ভেতরের বীজগুলো প্রায় এক বছর পর্যন্ত সতেজ থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদী সবুজায়নের সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখে। ফলে নির্বাচনী ময়দান কেবল পোস্টারের আবর্জনায় ঢেকে না গিয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে একটি সম্ভাব্য বাগানে।
বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির লিফলেটে এই কাগজের ব্যবহার ভোটারদের কাছে এক শক্তিশালী ও মানবিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে— “একটি লিফলেট মানেই একটি জীবনের সম্ভাবনা”। নির্বাচনী সভা-সমাবেশ শেষে যেখানে চারদিকে কাগজ ও প্লাস্টিকের স্তূপ পড়ে থাকার কথা, সেখানে এই ‘বীজযুক্ত লিফলেট’ মাটির সাথে মিশে গিয়ে জন্ম দিচ্ছে টমেটো, মরিচ ও বিভিন্ন শাকসবজির চারা। এর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনেও মাহমুদুর রহমান তামিমের মতো তরুণ প্রার্থীরা তাদের প্রচারণায় এই সবুজ পদ্ধতি বেছে নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চমক সৃষ্টি করেছেন। ভোটারদের মনে এই উদ্যোগটি কেবল প্রার্থীর প্রচারণা হিসেবে নয়, বরং আগামীর সবুজ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। মূলত প্রযুক্তির লড়াই আর রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে ‘বন কাগজ’ হয়ে উঠেছে এক অনন্য সাইলেন্ট বিপ্লব, যা মাটির গভীরেও সম্ভাবনার বীজ বুনে যাচ্ছে।
৫
অন্তর্ভুক্তি ও নৃ-তাত্ত্বিক অধিকার: নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন মাইলফলক।
২০২৬-এর নির্বাচনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির এক অনন্য নজির সৃষ্টি হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জন্য তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানে বসবাসরত ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে ১০টি ভিন্ন ভাষায় প্রায় ৮০ হাজার প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছে। মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম ও চাকের মতো জাতিগোষ্ঠীর অনেকে বাংলা পড়তে বা লিখতে না পারায় এই উদ্যোগ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জেলা বিএনপির সদস্য অংজাই উই চাকের সমন্বয়ে এবং সাচিংপ্রু জেরীর উদ্যোগে তৈরি এই লিফলেটগুলো পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলেও প্রার্থীর বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বান্দরবান আসনের মোট ভোটারের প্রায় ৪১ শতাংশই পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, যাদের মধ্যে এই নিজস্ব ভাষার প্রচারণা নির্বাচনের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা তৈরি করেছে। মারমা ভাষায় ৫০ হাজার এবং ম্রো ভাষায় ১০ হাজারসহ অন্যান্য ভাষায় হাজার হাজার ইশতেহার বিতরণের ফলে ভোটার উপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি কেবল একটি নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং জাতিগত বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সকলকে সম্পৃক্ত করার এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। পাহাড়ের নিজস্ব ভাষায় ‘৩১ দফা’ বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির এই প্রচার মূলত প্রান্তিক মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথকেই প্রশস্ত করেছে। শেষ পর্যন্ত এই ভাষাগত সেতুবন্ধন নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
৬
২০২৬-এর এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনের কঠিন পরীক্ষা। এআই-চালিত অপতথ্য আর ‘আলবটর’-এর মতো ডিজিটাল অপশক্তির অদৃশ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ভোটাররা একটি সত্যনিষ্ঠ আগামীর স্বপ্ন দেখছেন। লুণ্ঠিত অস্ত্রের ঝনঝনানি আর নিরাপত্তার উদ্বেগ ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা- ১২ ফেব্রুয়ারি ভোরে ব্যালট পেপারেই ফুটবে গণতন্ত্রের আসল ফুল। প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব এড়িয়ে এবং ‘বন কাগজে’র মতো পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবনকে সঙ্গী করে এই নির্বাচন এক নতুন ও সবুজ বাংলাদেশের বার্তা দিচ্ছে। পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠী থেকে শুরু করে সমতলের ১০ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী- সবারই কাম্য একটি সংঘাতমুক্ত, স্বচ্ছ ও উৎসবমুখর ভোটদানের পরিবেশ। ১২ তারিখ সন্ধ্যার গোধূলি লগ্নে যখন ভোট গণনার ফল আসবে, তখন যেন তা কেবল জয়-পরাজয় নয়, বরং জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটায়।
পোস্ট ভিউঃ 21