লুণ্ঠিত অস্ত্র ও সীমান্ত পেরিয়ে আসা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র: শঙ্কায় ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট

লেখালোক সমসাময়িক বিষয়
লুণ্ঠিত অস্ত্র ও সীমান্ত পেরিয়ে আসা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র: শঙ্কায় ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অগ্নিপরীক্ষার মুহূর্ত। এই নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ অস্ত্রের আশঙ্কাজনক ঝনঝনানি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থিতিশীল সময়ে থানা থেকে লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে আছে। লুণ্ঠিত অস্ত্রের প্রায় ১৫ শতাংশ এবং গুলির প্রায় ৩০ শতাংশ এখনো উদ্ধার না হওয়া প্রশাসন ও ভোটার—উভয় পক্ষকেই চরম উদ্বেগের মধ্যে রেখেছে। এর সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সীমান্ত পেরিয়ে আসা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অনুপ্রবেশ, যা সংঘাতের আশঙ্কাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পেশিশক্তি ও অস্ত্রের দাপটে নির্বাচনী ব্যালটের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার এই আশঙ্কা এখন প্রতিটি নাগরিকের মনে। যদিও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘যৌথ অভিযান’ ও ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তবে উদ্ধারহীন অস্ত্রের পরিমাণ এখনো জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করে রেখেছে। সাধারণ মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা—ভোটের আগেই এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে একটি ভয়হীন নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক। অস্ত্রের আস্ফালন থামিয়ে ব্যালটের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।


লুণ্ঠিত অস্ত্রের অমীমাংসিত পরিসংখ্যান।


সেনাবাহিনী এবং পুলিশ সদর দপ্তরের ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানা ও বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বিশাল অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী লুণ্ঠিত মোট ৫,৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ বা ৪,৪২৮টি অস্ত্র উদ্ধার করা গেলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছে ১,৩৩৫টি। গোলাবারুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক; লুণ্ঠিত ৬,৫১,৬০৯ রাউন্ড গুলির মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে, যার অর্থ এখনও ২,৫৬,০০০-এর বেশি তাজা বুলেট অপরাধীদের হাতে রয়ে গেছে। এছাড়া টিয়ারগ্যাস গান এবং গ্রেনেডের মতো অন্যান্য সরঞ্জামের প্রায় ২০ শতাংশ এখনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাগালের বাইরে। উদ্ধার অভিযান চললেও এই বিশাল পরিমাণ অস্ত্রের হদিস না পাওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক পিস্তল ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেলগুলো এখনো উদ্ধার না হওয়ায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে নাশকতার আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। নিখোঁজ এই অস্ত্রগুলো মূলত ঢাকার বাইরের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা এবং চিহ্নিত অপরাধী চক্রের ডেরায় মজুত থাকার সম্ভাবনা বেশি বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে।


এই অমীমাংসিত পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ (অবঃ) সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক মতবিনিময় সভায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ১৫ শতাংশ আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৩০ শতাংশ গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার না হওয়ায় ভোটের মাঠে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বর্তমানে পেশাদার অপরাধী, উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক ক্যাডারদের হাতে রয়েছে, যা নির্বাচনী  সহিংসতাকে উসকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সাধারণ মানুষের ভয় হলো, নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্র দখল বা ভোটারদের ভয় দেখাতে এই অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হতে পারে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। উদ্ধার না হওয়া এই আড়াই লাখের বেশি গোলাবারুদ যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই লুণ্ঠিত এই অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এখন সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


সীমান্ত পথে অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ (২০২৬-এর পরিস্থিতি) ।


২০২৬ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেটগুলো নজিরবিহীনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিজিবি’র তথ্যমতে, গত জানুয়ারি মাসে সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র আটকের ঘটনা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আসন্ন নির্বাচনের নিরাপত্তাঝুঁকিকে স্পষ্ট করে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেই রাজশাহীর বাঘা সীমান্ত থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন এবং ৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টকে ‘অস্ত্রের প্রবেশপথ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে সাতক্ষীরা, টেকনাফ, বেনাপোল এবং কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের হার সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে বাজারে স্মল আর্মস-এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় সেমি-অটোমেটিক পিস্তলের চোরাচালান আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর পাশাপাশি নাশকতার উদ্দেশ্যে আইইডি তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে এগুলো দেশের ভেতরে ঢুকে নির্বাচনী সহিংসতাকে উসকে দেয়ার লক্ষ্যেই আনা হচ্ছে। এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি বর্তমানে সীমান্তে রেড অ্যালার্ট জারি করলেও চোরাচালানের এই ক্রমবর্ধমান পরিসংখ্যান জনমনে প্রবল আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।


নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপ: ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’।


২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশব্যাপী ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করছে। এর অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট: ফেজ-২’ কার্যক্রম অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে চলমান রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি মাসে একদিনের বিশেষ অভিযানেই সারাদেশে ১,৯২১ জন সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা অপরাধী দমনে বাহিনীর দৃঢ় অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। নির্বাচনের দিন এবং এর আগে-পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১,৫০,০০০ পুলিশ, ১,০০,০০০ সেনাসদস্য এবং প্রায় ৫,৬০,০০০ আনসার সদস্যসহ মোট প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এবারই প্রথম বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি অন্তত ৪১৮টি ড্রোনের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে আকাশপথে নজরদারি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আধুনিক এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ভোটকেন্দ্রে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে। বাহিনীর এই নজিরবিহীন প্রস্তুতি মূলত লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্রের প্রভাবমুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত। তবে বিশাল এই জনবল ও প্রযুক্তির সমন্বয় মাঠ পর্যায়ে কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের নিরাপত্তা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের ফলে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হলেও সাধারণ ভোটাররা এখনো চূড়ান্ত পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছেন।


সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও শঙ্কা।


নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একটি “নিরাপদ পরিবেশ” তৈরির জোরালো দাবি করা হলেও, মাঠপর্যায়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট এখনো প্রবল। সাধারণ মানুষের প্রধান শঙ্কার জায়গা হলো থানা থেকে লুণ্ঠিত আধুনিক পিস্তল বা সাব-মেশিনগানগুলো, যা এখনো উদ্ধার হয়নি এবং ভোটের দিন বুথ দখলের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। ভোটাররা আশঙ্কা করছেন যে, এই অস্ত্রগুলোর অপব্যবহার হলে নির্বাচনী সহিংসতা ও প্রাণহানি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই ভয়ংকর পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে জনগণের স্পষ্ট প্রত্যাশা হলো—ভোট শুরু হওয়ার অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে নিখোঁজ অস্ত্রের শতভাগ উদ্ধার নিশ্চিত করা। একই সাথে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষ কেবল কাগজে-কলমে নিরাপত্তা চায় না, বরং তারা কেন্দ্রে গিয়ে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের বাস্তব পরিবেশ দেখতে চায়। যদি প্রশাসন লুণ্ঠিত অস্ত্রের প্রভাবমুক্ত ভোট নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা চিরতরে ধসিয়ে দিতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট কেবল নিরাপদ তখনই হবে, যখন রাজপথ থেকে অস্ত্রের গর্জন থামিয়ে ভোটের পরিবেশকে পুরোপুরি জনবান্ধব করা সম্ভব হবে।


১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার এক অগ্নিপরীক্ষা। লুণ্ঠিত অস্ত্রের অমীমাংসিত পরিসংখ্যান এবং সীমান্ত পথে অবৈধ অনুপ্রবেশের চ্যালেঞ্জ থাকলেও, রাষ্ট্রযন্ত্রের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান একটি শান্তিপূর্ণ ভোরের ইঙ্গিত দেয়। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর মতো নিবিড় অভিযান এবং ড্রোন প্রযুক্তির সংমিশ্রণ প্রমাণ করে যে, প্রশাসন এবার জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল। তবে এই প্রস্তুতির চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে মাঠ পর্যায়ে আইন-প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষতা এবং দ্রুততম সময়ে নিখোঁজ অস্ত্রের বড় অংশটি নিষ্ক্রিয় করার ওপর। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি অস্ত্রের গর্জনে নয়, বরং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারের শান্তিতে নিহিত। আসন্ন নির্বাচনে যদি অবৈধ অস্ত্রের ছায়া থেকে ব্যালট বক্সকে মুক্ত রাখা যায়, তবে তা কেবল একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই উপহার দেবে না, বরং ভবিষ্যতে যে কোনো অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার এক অনন্য নজির স্থাপন করবে। সাধারণ মানুষের শঙ্কাকে শক্তিতে রূপান্তর করতে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টাই হতে পারে সহিংসতামুক্ত বাংলাদেশের রক্ষাকবচ। সব বাধা ডিঙিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট পেপারে জয়ের প্রতিফলন ঘটুক—অস্ত্রের নয়, জনগণের ইচ্ছার।



পোস্ট ভিউঃ 21

আপনার মন্তব্য লিখুন