সবার আগে বাংলাদেশ: বাস্তবমুখী পররাষ্ট্রনীতিতে বন্ধুত্বের সীমানা ও জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার

লেখালোক সমসাময়িক বিষয়
সবার আগে বাংলাদেশ: বাস্তবমুখী পররাষ্ট্রনীতিতে বন্ধুত্বের সীমানা ও জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার

১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতিটি একসময় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার ঢাল হলেও ২০২৬ সালের জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট-পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশ’ তার পররাষ্ট্রনীতিতে এক ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ‘নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতা’র বদলে ‘সক্রিয় জাতীয় স্বার্থ’ প্রাধান্য পাচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একদিকে যেমন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কার ‘ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন’ অবস্থানের ছাঁচে ফিরছে, তেমনি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনে নিজেকে পুনর্গঠিত করছে। সমসাময়িক বিশ্বব্যবস্থা এখন আর কেবল আদর্শিক শান্ত সমীকরণে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি পরাশক্তিদের বহুমাত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সামরিকায়নের এক রণক্ষেত্র। এমতাবস্থায় কেবল বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; বরং প্রয়োজন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও সামরিক সক্ষমতার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানো। বাংলাদেশ এখন কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অনুসারী না হয়ে নিজের ভৌগোলিক গুরুত্বকে পুঁজি করে এক সাহসী ও প্রো-অ্যাক্টিভ কূটনীতি অনুসরণ করার উদ্যোগ নিয়েছে।


পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা ও নিরপেক্ষতার নতুন সংজ্ঞা।


বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা আর শীতল যুদ্ধের সেই দ্বি-মেরু কেন্দ্রিক শান্ত সমীকরণে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পরাশক্তিদের আধিপত্যের লড়াই বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এই উত্তাল প্রেক্ষাপটে কেবল আদর্শিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি, যা রাষ্ট্রকে তার চিরচেনা ‘নিষ্ক্রিয়তা’ ভেঙে নতুন কৌশল অবলম্বনে বাধ্য করছে।


ক। সক্রিয় কূটনীতি। 

ঐতিহাসিক ‘নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতা’ আজ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে, যা সুইজারল্যান্ড বা জাপানের মতো দেশগুলোর সাম্প্রতিক সামরিকায়নের পথ অনুসরণ করলেই স্পষ্ট বোঝা যায়—যেখানে জাপান ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশও এখন সেই নীরব অবস্থান ভেঙে ‘সক্রিয় প্রতিরক্ষা’ ও ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ নীতি গ্রহণ করতে যাচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংকটে কেবল দর্শক না থেকে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে সাহসী অবস্থান নেয়া হবে। তুরস্ক যেভাবে ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটে ‘ব্ল্যাক সি গ্রেইন ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রেখেছে, বাংলাদেশও তেমনি ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নিজের কণ্ঠস্বরকে জোরালো করে একবিংশ শতাব্দীর ‘স্মার্ট কূটনীতি’র পথ বেছে নিতে যাচ্ছে।


খ। জিয়াউর রহমানের নীতির প্রতিফলন। 

বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব ১৯৭০-এর দশকের সেই বাস্তববাদী ধারায় ফিরছে, যেখানে ভারতনির্ভরতা কমিয়ে পশ্চিম, চীন এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কের এক সুদৃঢ় সমতা রক্ষা করা হয়েছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘সার্ক’ দর্শনের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্যবাদের বদলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে আঞ্চলিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছে। ১৯৭৬-৭৮ সালের মধ্যে জিয়াউর রহমান যেমন ৭৩৫ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন সহায়তা নিশ্চিত করে বৈদেশিক সম্পর্কে বৈচিত্র্য এনেছিলেন, বর্তমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিও তেমনি কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অনুসারী না হয়ে নিজস্ব ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্বকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দরকষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং চীনের কারিগরি সহায়তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দিল্লির সাথে ‘সমান সার্বভৌমত্বের’ ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করা সম্ভব।


বন্ধুত্বের সীমানা ও আঞ্চলিক সমীকরণ।


বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে বন্ধুত্বের সীমানা নির্ধারিত হচ্ছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে, যেখানে কোনো একক শক্তির প্রভাব নয় বরং দেশের সার্বভৌমত্বই শেষ কথা। ফলে আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন প্রথাগত আনুগত্যের বদলে ‘রেসিপ্রোসিটি’ বা পারস্পরিক বিনিময়ের নীতিকে অগ্রাধিকার দিতে চায়।


ক। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। 

বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের সাথে সম্পর্ককে ‘আধিপত্য’ নয় বরং ‘পারস্পরিক সমতা’র ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা হচ্ছে, যেখানে জাতীয় স্বার্থই হবে সম্পর্কের মূল মাপকাঠি। ১৮ মাসের দীর্ঘ স্থবিরতা ও ভিসা জটিলতার মতো প্রতিকূলতা কাটিয়ে এখন সমান সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এটি মূলত ট্রানজিট, কানেক্টিভিটি বা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কেবল একপাক্ষিক সুবিধা প্রদান নয়, বরং ২০২৬ সালের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে শুল্কহীন বাণিজ্য এবং অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের হিস্যা নিশ্চিত করার এক কৌশলগত অবস্থান। ভারতের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে সম্মান জানালেও, সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহিঃশক্তির প্রভাবমুক্ত থাকা এখন ঢাকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রধান শর্ত।


খ। সার্ক পুনরুজ্জীবন। 

দক্ষিণ এশিয়ায় একক কোনো দেশের একচ্ছত্র আধিপত্যের বদলে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্মিলিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ‘সার্ক’-কে পুনরুজ্জীবিত করা এখন বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী তাঁর নির্বাচন পরবর্তী প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এই কথাই উল্লেখ করেছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত এই আঞ্চলিক জোটের ধারণাকে ফিরিয়ে আনার মূল উদ্দেশ্য হলো—প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। সার্ক সফলভাবে কার্যকর হলে তা আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক সুষম ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম হবে।


প্রতিরক্ষা সক্ষমতা: সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ।


একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সমান্তরালে তার সামরিক শক্তিতে স্বনির্ভর হওয়া এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সার্বভৌমত্ব রক্ষার গ্যারান্টি। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সামরিক শক্তির সামঞ্জস্য বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি, কারণ সুরক্ষিত সীমান্ত ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন স্থায়িত্ব পায় না।


ক। বাজেট ও জিডিপি।

বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিরক্ষা বাজেটকে ১.২% থেকে বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারত তাদের জিডিপির ২.৪%, পাকিস্তান ৩.৮% এবং মিয়ানমার ৩% এর বেশি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করে, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জিডিপির অন্তত ২% থেকে ২.৫% সামরিক খাতে বরাদ্দ করা প্রয়োজন। এই শক্তিশালী বাজেট বরাদ্দ কেবল সমরাস্ত্র ক্রয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করবে।


খ। ব্লু ইকোনমি ও নৌ-নিরাপত্তা।

বঙ্গোপসাগরের প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার বিশাল জলরাশি ও এর ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সমুদ্র সম্পদের সুরক্ষায় নৌ ও বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন এখন সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি। মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা জয়ের পর বিশাল মৎস্য সম্পদ ও খনিজ ব্লকগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌ-বাহিনীতে ত্রিমাত্রিক সক্ষমতা এবং বিমান বাহিনীতে আধুনিক মেরিটাইম স্ট্রাইক এয়ারক্রাফট সংযোজন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। গভীর সমুদ্রে বিদেশি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং নিজস্ব সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনাকে নিরাপদ রাখতে একটি শক্তিশালী নৌ-বহর ও কোস্টগার্ড গঠন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সেটা হতে পারে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি।


কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও বহুমুখী বলয়।


আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে কোনো একক রাষ্ট্রের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখন একক উৎসের বলয় থেকে বেরিয়ে এসে একটি ‘হাইব্রিড’ প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলছে, যেখানে বিভিন্ন পরাশক্তির প্রযুক্তি ও সহযোগিতার সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে। এই বহুমুখী কৌশল কেবল সমরাস্ত্রের যোগান নিশ্চিত করে না, বরং যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও দরকষাকষির সক্ষমতাকে সুসংহত রাখে।


ক। তুরস্ক ও প্রযুক্তি।

তুরস্কের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বর্তমান বাংলাদেশের জন্য কেবল সমরাস্ত্র ক্রয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে ‘বায়রাক্তার টিবি-২’ (Bayraktar TB2) ড্রোনের মতো বিশ্বখ্যাত সমরযানের সফল সংযোজন এবং দেশীয়ভাবে ড্রোন উৎপাদনের লক্ষে ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’ বা প্রযুক্তি স্থানান্তর চুক্তি বাংলাদেশের আকাশসীমার প্রতিরক্ষায় এক ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করছে। ২০২৫ সালের শেষার্ধ এবং ২০২৬ সালের শুরু নাগাদ তুরস্কের সাথে এই সহযোগিতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে SİPER ও HİSAR O+ এর মতো অত্যাধুনিক লং-রেঞ্জ ও মিডিয়াম-রেঞ্জ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের সম্ভাব্য সংযোজন। বর্তমানে বাংলাদেশ তুরস্কের প্রতিরক্ষা পণ্যের ৪র্থ বৃহত্তম আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে এবং তুরস্কের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান MKE-এর সহায়তায় বাংলাদেশে উন্নত কামানের গোলা বা আর্টিলারি শেল উৎপাদন শুরু হয়েছে। এই বহুমুখী অংশীদারিত্ব ঢাকাকে নির্দিষ্ট কোনো পরাশক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে ন্যাটো-মানসম্পন্ন প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।


খ। আমেরিকা ও চীন।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কৌশলে আমেরিকা ও চীন—উভয় পরাশক্তির সাথেই একটি সূক্ষ্ম অথচ শক্তিশালী ভারসাম্য বজায় রাখা হচ্ছে। উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে জিপিএস-গাইডেড সমরাস্ত্র, সাইবার নিরাপত্তা এবং উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য আমেরিকার সাথে সম্পর্ক গভীর করা হচ্ছে, যার অংশ হিসেবে গত কয়েক বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলমান। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর প্রায় ৭০-৮০ শতাংশই ঐতিহাসিকভাবে চীনা প্রযুক্তিনির্ভর; বর্তমানে চীনের সহায়তায় কক্সবাজারের পেকুয়ায় সাবমেরিন ঘাঁটির মতো মেগা প্রকল্প এবং অত্যাধুনিক এফএম-৯০ (FM-90) সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেমের মাধ্যমে দেশের আকাশ ও নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে। ২০২৬ সালের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ একদিকে চীনের কাছ থেকে সাশ্রয়ী ও ভারী যুদ্ধাস্ত্র নিচ্ছে, অন্যদিকে সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও পেশাদারিত্বের প্রয়োজনে আমেরিকার সাথে এনডিএ কাঠামোর আওতায় সহযোগিতা বৃদ্ধি করছে।


গ। মুসলিম বিশ্ব ও পাকিস্তান।

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষিতে একচেটিয়া নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ এখন সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মতো মুসলিম দেশগুলোর সাথে পেশাদার সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে থাকা কূটনৈতিক শীতলতা কাটিয়ে বর্তমানে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে, যা দক্ষিণ এশীয় শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। পাকিস্তানের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি (যেমন: শাহীন বা বাবর সিরিজ সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা) এবং ‘মাউন্টেন ওয়ারফেয়ার’ বা পাহাড়ি যুদ্ধকৌশল বিনিময়ে উভয় দেশ এখন অনেক বেশি আগ্রহী। একইসাথে ওআইসি ভুক্ত দেশগুলোর সাথে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ এবং যৌথ সামরিক মহড়া বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী মুসলিম প্রতিরক্ষা বলয় গড়ার পথে হাঁটছে। এই কৌশলগত সম্পর্ক ঢাকাকে কেবল আঞ্চলিক রাজনীতিতে একক শক্তির প্রভাবমুক্ত রাখতেই সাহায্য করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর বিশাল বাণিজ্যিক বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকারকেও ত্বরান্বিত করবে।


অর্থনৈতিক কূটনীতি ও জাতীয় স্বার্থ।


২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন সমীকরণ উন্মোচিত হবে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা হ্রাস পাওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রথাগত দাতা-নির্ভর কূটনীতির বদলে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’ হবে রাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার খোঁজা এবং দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনই হবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।


ক। পেশাদারিত্বের প্রয়োগ ও বাজার সম্প্রসারণ। 

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী সময়ে জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকার সাথে নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য ‘হাব’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। বিশেষ করে আসিয়ান ও আরসিইপি-এর মতো বড় অর্থনৈতিক জোটগুলোর সাথে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্সের নতুন উৎস খুঁজে বের করাই হবে বাস্তবমুখী কূটনীতির আসল পরীক্ষা।


খ। তৃতীয় দেশের প্রভাবমুক্ত সম্পর্ক। 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম স্তম্ভ হওয়া উচিত যেকোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো দেশের পছন্দ-অপছন্দ বা প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা। কোনো দেশের সাথে আমাদের বাণিজ্যিক বা কৌশলগত সম্পর্ক কেমন হবে, তা নির্ধারিত হবে সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাভ ও জাতীয় নিরাপত্তার নিরিখে। ড. ইমতিয়াজ আহমেদের ভাষায়, “আমাদের যেটা দরকার সেটা হলো, কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে যেন তৃতীয় দেশের ওপর নির্ভর করতে না হয়।” এই সার্বভৌম অবস্থানই আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করবে এবং বড় শক্তিগুলোর সাথে দরকষাকষিতে আমাদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।


সবার আগে বাংলাদেশ’ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি একবিংশ শতাব্দীর নিষ্ঠুর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় টিকে থাকার এক অপরিহার্য কৌশল। বন্ধুত্বের হাত সবার দিকে প্রসারিত থাকলেও, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বাংলাদেশ আজ অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং প্রো-অ্যাক্টিভ। ১৯৭৪-এর নৈতিক ভিত্তি আর ২০২৬-এর সামরিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে যে মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে, তা আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে এক নতুন উচ্চতা দিয়েছে। পুরাতন নীতির নির্যাস এবং আধুনিক বিশ্বের প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তির সুসমন্বয় ঘটিয়ে বাংলাদেশ আজ একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার পথে দৃপ্তপদে এগিয়ে যাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর কূটনীতিতে শান্তির প্রকৃত গ্যারান্টি যখন শক্তি, তখন সেই শক্তির ভিত্তি হিসেবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিই হবে আমাদের আগামীর অবিচল পথপ্রদর্শক।



পোস্ট ভিউঃ 21

আপনার মন্তব্য লিখুন